বাসা ভাড়ার বিরোধে ব্যবসায়ীর মৃত্যু, আটক ২

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
বাসা ভাড়ার বিরোধে ব্যবসায়ীর মৃত্যু, আটক ২

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে বাসা ভাড়ার টাকা নিয়ে কথাকাটাকাটি থেকে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় রূপ নিয়েছে। স্বপন (৬২) নামে ওই ব্যবসায়ীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাটি রাজধানীতে সামান্য আর্থিক বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়াতে পারে, সে বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ভোর প্রায় ৪টার দিকে আজিমপুর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের ৪ নম্বর ভবনের একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে। অচেতন অবস্থায় স্বপনকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভোর ৫টার দিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত স্বপন দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে কসমেটিকস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তান ছিল না। বড় ভাই রাজা মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে তিনি আজিমপুর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, বহুদিন ধরেই তাঁরা নিয়মিতভাবে ওই বাসায় বসবাস করে আসছিলেন এবং ভাড়া পরিশোধের বিষয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

নিহতের বড় ভাই রাজা মোহাম্মদ সেলিম জানান, যে ব্যক্তির নামে সরকারি কোয়ার্টারের বাসাটি বরাদ্দ রয়েছে, তাঁর ছেলে রিজভির কাছে ভাড়া দেওয়ার কথা ছিল। রোববার তাঁকে বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে কলব্যাক করে অশালীন ভাষায় কথা বলেন বলে অভিযোগ করেন সেলিম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে তখন থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়।

পরিবারের অভিযোগ, সোমবার ভোরে রিজভি তাঁর চাচাতো ভাই রোহানকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় আসেন। বাসা ভাড়ার টাকা নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, রিজভি ও রোহান মিলে সেলিম ও স্বপনকে মারধর করেন। এ সময় স্বপনের বুকে একাধিক কিল-ঘুষি মারা হয় এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এতে তিনি মেঝেতে পড়ে অচেতন হয়ে যান।

পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, স্বপন অচেতন হয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সহায়তা করেন। তবে চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল এবং কিছুক্ষণ পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আকস্মিক এই ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা শোকাহত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন প্রাণহানির ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে কিছু ভিন্ন তথ্যও সামনে এসেছে। লালবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কিরণ মিয়া জানান, বাসা ভাড়ার টাকা নিয়ে বিরোধের সময় ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে স্বপন মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে যান। পড়ে গিয়ে তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং রক্তক্ষরণ হয়। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত রিজভি ও রোহানকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামতও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বপনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বুকে আঘাতের কারণে মারা গেছেন, নাকি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়াই মৃত্যুর মূল কারণ—এ বিষয়টি ফরেনসিক পরীক্ষার পর পরিষ্কার হবে। সেই অনুযায়ী মামলার তদন্তও এগিয়ে নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আজিমপুর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার দীর্ঘদিন ধরে ঘনবসতিপূর্ণ একটি আবাসিক এলাকা। এখানে বিভিন্ন সময় বাসা ভাড়া, দখল বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে ছোটখাটো বিরোধের ঘটনা ঘটলেও তা সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে মিটে যায়। তবে এবারের ঘটনায় একজন মানুষের প্রাণহানি স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামান্য আর্থিক বা ব্যক্তিগত বিরোধও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। সংযম হারিয়ে হাতাহাতি বা শারীরিক আক্রমণের ঘটনা শেষ পর্যন্ত অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পারস্পরিক সংলাপ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব এবং বিরোধ নিষ্পত্তির শান্তিপূর্ণ উপায় অনুসরণ করা জরুরি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিরোধের জেরে শারীরিক হামলার অভিযোগ উঠলে ঘটনার প্রকৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, আলামত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আদালতে এসব তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে এবং দায় নির্ধারণ করা হবে।

বর্তমানে স্বপনের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এদিকে নিহতের স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

রাজধানীতে বাসা ভাড়ার মতো একটি সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করে একজন ব্যবসায়ীর প্রাণহানির এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, মুহূর্তের উত্তেজনা এবং সহিংস আচরণ কত সহজেই একটি পরিবারকে অপূরণীয় শোকের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে নিহতের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সবাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত