নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে নেত্রকোনার হাজারো জেলে পরিবার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ বার
নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে নেত্রকোনার হাজারো জেলে পরিবার

প্রকাশ: ১৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুড়ির হাওরাঞ্চল এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। দেশের অন্যতম মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই জনপদ আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতার সাক্ষী। মৎস্য প্রজনন মৌসুম রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, যার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়—মাছের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার আড়ালে ঢাকা পড়েছে হাওরপারের হাজারো জেলে পরিবারের কান্নার রোল। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাদের চুলায় আগুন জ্বলে না। সরকার যখন হাওরের মাছ বাঁচাতে তৎপর, তখন সেই মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলো তাদের জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে। অভাবের তাড়নায় তারা আইন ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে, আর সেই আইন ভাঙার দায়ে তাদের ওপর নেমে আসছে আইনি খড়গ, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অমানবিক করে তুলেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ হাজার ৩৭৮ জন। কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে আরও ৩০ থেকে ৪০ হাজার অনিবন্ধিত বা মৌসুমি জেলে, যারা জীবনযাত্রার প্রয়োজনে হাওর-বিল-নদীর মাছ শিকারের ওপরই নির্ভর করে। মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুড়ির মতো উপজেলাগুলোতে এই জেলেদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গত ২৮ মে থেকে শুরু হওয়া প্রথম দফার নিষেধাজ্ঞার পর বর্তমানে দ্বিতীয় দফার নিষেধাজ্ঞা চলছে। মৎস্য প্রজনন মৌসুম রক্ষা করার জন্য এই উদ্যোগ গৃহীত হলেও জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো সুব্যবস্থা নেই, নেই কোনো খাদ্য সহায়তা। পেটের ক্ষুধা কি কেবল মাইকিং বা সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়ে নিবৃত্ত করা সম্ভব? হাওরপাড়ের জীর্ণ কুঁড়েঘরগুলোতে এখন হাহাকার। মাছ ধরলে আইন অমান্য, আর না ধরলে অর্ধাহার-অনাহার—এমনই এক কঠিন দ্বিমুখী সংকটে তাদের জীবন অতিষ্ঠ।

গত ৩ জুন সরকারি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যখন হাওরে ১৬ টন পোনা অবমুক্ত করা হয়, তখন স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু পোনা অবমুক্তির পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকার কোনো সুরাহা না হওয়ায় সেই আশা দ্রুত নিরাশায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসন যখন মাঠ পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে যায়, তখন সাধারণ জেলেদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। গত ১২ জুলাই ডিঙ্গাপোতা হাওর থেকে পুলিশ যখন জাল আটক করে, তখন ক্ষুধার্ত জেলেরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা এবং পরবর্তীতে ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৮০০ থেকে ১১০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলার ভয় এখন হাওরপাড়ের প্রতিটি জেলে পরিবারকে গ্রাস করেছে। আইন মেনে চলার ইচ্ছা তাদের আছে, কিন্তু পরিবার চালানোর উপায় তাদের জানা নেই।

তেতুলিয়া ইউনিয়নের এক প্রবীণ জেলে অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এই অঞ্চলে মাছ ধরা নিয়ে এতটা কড়াকড়ি কখনো দেখা যায়নি। এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তারা জাল ও নৌকা কিনেছেন। মাছ ধরতে না পারলে এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা দূরের কথা, প্রতিদিনের খাবার যোগানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। খালিয়াজুড়ির জেলে আমির হোসেনের কথা যেন এই অঞ্চলের প্রতিটি জেলে পরিবারের প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, সরকারের আইন মানতে তারা প্রস্তুত, কিন্তু আইন মানার পাশাপাশি সরকার যেন বাঁচার একটি পথ বাতলে দেয়। মাছ ধরা বন্ধ হলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। হাওরের বোরো ধান যখন পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল, তখনও তারা টিকে ছিল মাছ ধরে। এখন মাছ ধরাও বন্ধ হওয়ায় তারা দিশেহারা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাটবাজার—সর্বত্র এখন একই আলোচনা, কীভাবে কাটবে এই দুঃসময়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা যেমন জাতীয় দায়িত্ব, তেমনি সেই মৎস্য সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করাও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব। মাছ রক্ষার সঙ্গে মানুষ রক্ষার পরিকল্পনা না থাকলে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে এবং সাধারণ জেলেরা বারবার অপরাধীর খাতায় নাম লেখাবে। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনও এই অমানবিক পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। যখন একটি জেলে পরিবার পেট ভরে ভাত খেতে পায় না, তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। হাওরের এই জেলেদের জন্য স্বল্পমেয়াদী খাদ্য সহায়তা, ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় আনা অথবা বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। কেবল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সংবেদনশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষের এই হাহাকার সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। হাজার হাজার জেলে পরিবার আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। মৎস্য প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার পর তারা আবার মাছ ধরতে পারবে, কিন্তু এই কয়েক মাসের অভুক্ত জীবন তাদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এনজিওর ঋণের বোঝা তাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আইনি মামলা। এই পরিস্থিতি যদি অচিরেই সমাধান করা না হয়, তবে হাওরাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। মাছ বাঁচাতে গিয়ে মানুষ মারার এই নীতি থেকে সরে এসে রাষ্ট্রের উচিত জেলেদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তাহলেই আইন মানার আগ্রহ তাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে এবং মৎস্য রক্ষা প্রকল্প সফল হবে। হাওরের অথৈ জলরাশি আজ তাদের জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে তাদের জন্য যেন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অভিশাপ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন মানবিক উদ্যোগ ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত