প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পুরো বিশ্ব। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আগামী রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও স্পেন। মহাকাব্যিক এই শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বাঁশি বাজানোর দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। ফিফা বৃহস্পতিবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। ৪৬ বছর বয়সী এই রেফারি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে বিশ্বকাপের ফাইনাল পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাদার জীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক।
স্লাভকো ভিনচিচের এই দায়িত্বপ্রাপ্তি আকস্মিক কিছু নয়, বরং দীর্ঘ দেড় দশকের কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার স্বীকৃতি। ২০১০ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির মর্যাদা লাভের পর থেকেই ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় তিনি নিজেকে এক নির্ভরযোগ্য রেফারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টে ২০২৪ সালের রিয়াল মাদ্রিদ ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যেখানে তিনি চমৎকার নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তাঁর শান্ত স্বভাব এবং মাঠে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রেফারির আসনে বসিয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ভিনচিচের পথচলা অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও সফল। কাতার বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়ার পর থেকেই তিনি নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল ও মরক্কোর মতো শক্তিশালী দুই দলের লড়াই সামলানোর পাশাপাশি জর্ডান ও আলজেরিয়ার ম্যাচ এবং নকআউট পর্বের শেষ বত্রিশে মেক্সিকো ও ইকুয়েডরের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটিতে তাঁর রেফারিং ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের ফাইনালটি হতে যাচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচ এবং চলতি আসরের চতুর্থ। তাঁর এই অভিজ্ঞতা ও ম্যাচ পরিচালনার পরিপক্কতা ফাইনাল ম্যাচেও বজায় থাকবে বলে আশা করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
তবে আর্জেন্টিনা দলের জন্য ভিনচিচকে খুব একটা সৌভাগ্যবান বলা যায় কি না, তা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে মৃদু শঙ্কা কাজ করছে। এর আগে মাত্র একবারই আর্জেন্টিনা ম্যাচে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। সেটি ছিল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে সেই আলোচিত ম্যাচটি, যেখানে লিওনেল মেসির দল ২-১ গোলে হেরেছিল। সেই ম্যাচেই ভিনচিচ সপ্তম মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাউল করার জন্য পেনাল্টি প্রদান করেছিলেন, যা থেকে মেসি গোল করেছিলেন। সেই পরাজয়ের ফলে আর্জেন্টিনার ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত থাকার দীর্ঘ গৌরবময় যাত্রা থমকে গিয়েছিল। ফলে বিশ্বকাপের ফাইনালে পুনরায় ভিনচিচের নাম ঘোষণা হওয়ায় আর্জেন্টিনার সমর্থকরা কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন, আবার অনেকেই মনে করছেন এবার ভিনচিচ হয়তো নতুন কোনো ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে স্পেনের সঙ্গে ভিনচিচের পরিচয় অনেক দীর্ঘ এবং বেশ ইতিবাচক। ২০১৭ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২০ ইউরোতে স্পেন ও সুইডেনের মধ্যকার ম্যাচ এবং ২০২৩ উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেন ও ইতালির মধ্যকার অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচটিও তিনি সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। বিশেষ করে স্পেনের তরুণ বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে তাঁর দুটি স্মরণীয় ম্যাচের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২৪ ইউরোতে ইতালির বিপক্ষে স্পেনের ১-০ গোলের জয় এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ২-১ গোলের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের রেফারি ছিলেন ভিনচিচ। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে ইয়ামালের সেই বিখ্যাত দূরপাল্লার গোলটি আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভাসে। সব মিলিয়ে স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভিনচিচের উপস্থিতি বেশ পরিচিত একটি দৃশ্য।
ফাইনাল ম্যাচটিকে ঘিরে ইতিমধ্যে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সাজসজ্জা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা তুঙ্গে। মাঠের ভেতরে স্লাভকো ভিনচিচকে সহযোগিতা করবেন তাঁরই স্বদেশি তোমাজ ক্লানচনিক ও আন্দ্রাজ কোভাচিচ। চতুর্থ রেফারি হিসেবে থাকবেন জর্ডানের আধহাম মাখাদমেহ এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন কাতারের মোহাম্মদ আলকালাফ। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাও এই ম্যাচটির গুরুত্ব বিবেচনা করে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্যানেল ঘোষণা করেছে। ফাইনালের মতো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে রেফারির প্রতিটি সিদ্ধান্ত খেলার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে, তাই ভিনচিচের কাঁধে এখন বিশাল দায়িত্ব।
ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি আবেগ ও স্বপ্ন। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং তরুণ তুর্কিদের নিয়ে গড়া স্পেনের মধ্যকার এই ফাইনালটি হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংঘাত। একদিকে মেসির শেষ বিশ্বকাপ জয়ের অমর গাঁথা, অন্যদিকে স্পেনের নতুন প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। এই দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্লাভকো ভিনচিচকে হতে হবে নিরপেক্ষ ও অবিচল। তাঁর বাঁশির প্রতিটি ফুঁ যেন হয় ন্যায়বিচারের প্রতীক। মাঠের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি রেফারি হিসেবে ভিনচিচও এখন কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ভিনচিচ কীভাবে সামাল দেন মেসি ও ইয়ামালদের সেই লড়াই।