মির্জাপুরে নৌকা ভ্রমণে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই যুবকের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮ বার
মির্জাপুরে নৌকা ভ্রমণে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই যুবকের মৃত্যু

প্রকাশ: ১৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আনন্দঘন এক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে মুহূর্তের মধ্যে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল একটি পরিবার। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নৌকা ভ্রমণে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুই তরুণ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মির্জাপুর উপজেলার ঝিনাই নদীর থলপড়া এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। আনন্দের আবহে শুরু হওয়া এই ভ্রমণ যে এমন এক হৃদয়বিদারক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে, তা কল্পনারও বাইরে ছিল সংশ্লিষ্ট সবার। নিহতেরা হলেন শেরপুর জেলার বাসিন্দা জিকুল (১৮) এবং রংপুর জেলার সাজ্জাদ (১৮)। এই ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয় মহলে জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, গাজীপুরের ভাওয়াল মির্জাপুর এলাকা থেকে প্রায় ৪০ জন যুবক আনন্দ ভ্রমণের লক্ষ্যে একটি নৌকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন। তাদের গন্তব্য ছিল মির্জাপুরের ঐতিহাসিক মহেড়া জমিদারবাড়ি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে তরুণদের সেই দলটি হাসি-ঠাট্টা আর গানে মেতে ছিল। কিন্তু ফেরার পথেই ঘটে বিপত্তি। ফতেপুর ইউনিয়নের থলপড়া এলাকার ঝিনাই নদীর ওপর দিয়ে অত্যন্ত নিচ দিয়ে ঝুলে ছিল বিদ্যুতের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তার। নৌকাটি যখন থলপড়া এলাকায় পৌঁছায়, তখন অসাবধানতাবশত নৌকার ওপরের অংশের সঙ্গে সেই ঝুলন্ত তারের স্পর্শ ঘটে। এতে মুহূর্তের মধ্যে নৌকাটি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ে।

নৌকার ওপর থাকা ছয়জন যুবক বিদ্যুতের তীব্র ঝটকায় আক্রান্ত হন। তাদের শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে শুরু করলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, নদীর ওপর দিয়ে যে বিদ্যুতের তার ঝুলে ছিল, তা অনেক নিচুতে ছিল যা চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘটনাস্থলেই জিকুল ও সাজ্জাদ অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়েন। অন্য চারজনও মারাত্মকভাবে দগ্ধ ও আঘাতপ্রাপ্ত হন। নৌকায় থাকা অন্য সঙ্গীরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন এবং স্থানীয়দের সহায়তায় অচেতন ও আহতদের দ্রুত মির্জাপুরের বিখ্যাত কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর চিকিৎসক জিকুল ও সাজ্জাদকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুর্ঘটনার পর আহত অপর চারজনকে কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে এবং তারা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত হওয়ার লড়াই করছেন। মির্জাপুর থানার উপপরিদর্শক রাশেদ ফজল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নিহত দুই যুবকের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়না তদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে তাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো ঘটনার একটি আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমুদিনী হাসপাতালে স্বজনদের কান্নার রোল পড়ে যায়। জিকুল ও সাজ্জাদের মৃত্যুর সংবাদে তাদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তাদের পরিবার এই তরুণদের নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখেছিল। অকাল এই মৃত্যুতে কেবল দুটি পরিবারই নয়, বরং পুরো এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। যারা একসাথে ভ্রমণে বেরিয়েছিল, তারা এখন সঙ্গীদের প্রাণহীন দেহ দেখে বাকরুদ্ধ। এমন আনন্দের ভ্রমণ যে মানুষের জীবনের শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা কেউই মেনে নিতে পারছে না। এই ঘটনার পর থেকেই হাওর ও নদী অঞ্চলে নৌ-চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর ওপর দিয়ে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারগুলো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নৌকা চলাচল বেশি, সেসব জায়গায় বিদ্যুৎ লাইন যথাযথ উচ্চতায় স্থাপন করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে তদারকির অভাবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই দুর্ঘটনার পেছনে দায়িত্বে কোনো অবহেলা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণ দাবি জানিয়েছেন যে, অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ তারগুলো সরিয়ে ফেলা হোক এবং নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন অকাল হারানোর বেদনায় পুড়তে না হয়।

এই দুর্ঘটনা কেবল মির্জাপুরের জন্য একটি শোকের সংবাদ নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিনোদন বা ভ্রমণের আনন্দ যেন কখনো জীবনের শেষ পরিণতির কারণ না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত। ভ্রমণের সময় পর্যটকদের নিজস্ব সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি পর্যটন সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব। মির্জাপুরের এই ঘটনাটি মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে যাবে দীর্ঘ সময়। দুই তরুণের অকাল প্রস্থান আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিল জীবনের অনিশ্চয়তার কথা। এই শোক কাটিয়ে ওঠা পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন, তবে শোকের এই কঠিন সময়ে আমরা তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।

পরিশেষে, প্রশাসনের কাছে আবেদন থাকবে, এই দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা যেন আর না থাকে, তা নিশ্চিত করা হোক। নদীর ওপর দিয়ে যারা বিদ্যুৎ লাইন টেনেছেন, তাদের গাফিলতি থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। জিকুল ও সাজ্জাদের আত্মার শান্তি কামনায় স্থানীয়রা শোকের আয়োজন করেছে। আশা করা যায়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে সচেতন হবে এবং নিরাপদ জনপদ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত