প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের লক্ষে ছাত্র-জনতার যে অভূতপূর্ব জাগরণ বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে, তা যেকোনো প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির জন্য ছিল একটি বড় পরীক্ষা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সংকটময় মুহূর্তে এ দেশের প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত বলয়টির ভূমিকা ছিল অনেকটাই ধূসর, দ্বিধাগ্রস্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়। গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে যখন রাজপথ উত্তাল, লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে এবং জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের মরণপণ লড়াই চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন প্রগতিশীল মহলের অভাবী অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির দীনতা রাজনীতি সচেতন মানুষকে ব্যথিত করেছে। প্রগতিশীলদের এই ব্যর্থতা কেবল সাময়িক কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের কোটারি রাজনীতি ও আদর্শিক দ্বিধার এক করুণ পরিণতি।
আন্দোলনের প্রথম দিকে যখন শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাণের দাবি নিয়ে মাঠে নামে, তখন প্রগতিশীল ও উদারপন্থী শক্তির পক্ষ থেকে খুব কমই দৃশ্যমান সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিক্রিয়া ছাড়া সাংগঠনিক পর্যায়ে যে দৃঢ় সংহতির প্রয়োজন ছিল, তার অনুপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। যদিও গণতন্ত্র মঞ্চের মতো কিছু সংগঠন শুরুতে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের সেই কর্মসূচিকে পুলিশি নির্যাতন, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের মাধ্যমে নিষ্ঠুরভাবে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। জোনায়েদ সাকি, হাসনাত কাইয়ুমসহ অনেক নেতার ওপর চালানো অমানবিক নিপীড়ন প্রমাণ করেছিল যে, স্বৈরাচারী সরকার প্রগতিশীল শক্তিকে কতটা ভয় পায়। তবুও, সামগ্রিক প্রগতিশীল বলয় হিসেবে এই গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল একেবারেই নগণ্য। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের আহ্বানে ‘দ্রোহযাত্রা’র মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগগুলো বাদে অধিকাংশ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনই যেন আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে ভুল করেছিল।
প্রগতিশীলদের এই নিস্তেজ ভূমিকার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিভ্রান্তি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনকালজুড়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ রক্ষার নামে যে ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল, তার ফাঁদে আটকা পড়েছিলেন অনেক প্রগতিশীল নেতা ও বুদ্ধিজীবী। তারা গুম, খুন ও ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোকে ‘মন্দ কিন্তু প্রয়োজনীয়’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো উদারপন্থী গণমাধ্যমগুলোর ওপর সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানাতে তারা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, উন্নয়নের স্বার্থে বা উগ্রবাদ দমনের নামে ফ্যাসিবাদী শাসন কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য। এই ভ্রান্ত ধারণা প্রগতিশীল শক্তিকে স্বৈরাচারের ‘বি-টিম’ হিসেবে মানুষের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদ কখনোই প্রগতিশীলতার বন্ধু হতে পারে না।
কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় প্রগতিশীলদের দ্বিধা ছিল আরও প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রগতিশীল সংগঠনগুলো তাদের তরুণ কর্মীদের আন্দোলনে যোগ দিতে বাধা দিয়েছে এই অজুহাতে যে, এই আন্দোলনগুলো ‘মৌলবাদীদের ফাঁদ’। অথচ এই ধরনের রক্ষণশীল ও ভীতু দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ সমাজের কাছে প্রগতিশীলদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একটি গণমুখী আন্দোলনকে মৌলবাদের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা প্রগতিশীল শিবিরে দেখা গেছে, তা শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এমনকি চট্টগ্রাম শহরে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে প্রগতিশীল সংগঠনের সদস্যরা নিজেরাই যখন ভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের সদস্যদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল, তখন এটি স্পষ্ট হয় যে, বিভাজন ও সংকীর্ণতাই তখন তাদের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৫২, ৬২, ৬৯ কিংবা ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাই পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় বা রাজনীতির মূলধারায় আবির্ভূত হয়েছেন। চব্বিশের এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন কেবল ‘উপকারের’ তালিকা নয়, বরং আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায়। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধকে কোনো পরিবারের বা দলের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহারের দিন শেষ হয়ে এসেছে। প্রগতিশীলদের নতুন করে ভাবতে হবে কেন তারা দীর্ঘদিন ধরে খনিজ সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের মতো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় সফল হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থ হয়েছে। সম্ভবত তারা ভূ-রাজনীতির বাস্তবতাকে স্বীকার করতে ভয় পেয়েছে অথবা নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভারতের হস্তক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় আনতে কুণ্ঠাবোধ করেছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে প্রগতিশীলদের যে অস্বস্তি, তা খুশবন্ত সিংয়ের প্রতিবেদনের মধ্য দিয়েই বহু আগে চিহ্নিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিদ্বেষ কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, বরং তা সরকারের দুর্নীতিপরায়ণতাকে ভারতের সমর্থনের ফলে সৃষ্ট। প্রগতিশীলদের একটি বড় অংশ এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল ‘উগ্রবাদ’ আতঙ্ক ছড়ানোতেই ব্যস্ত ছিল। ফলে যখন গণ-অভ্যুত্থান ঘটল, তখন তারা দেখল যে, জনতা তাদের আর অনুসরণ করছে না। রাষ্ট্রীয় নানা নীতি নির্ধারণে, সংবিধান সংস্কারে বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের মতো ঐতিহাসিক মুহূর্তেও আজ প্রগতিশীল শক্তিগুলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতিহীনতার কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। অথচ অভ্যুত্থানের পর মাজারে হামলা, নারীদের হেনস্তা বা গণমাধ্যমে আগুনের মতো ঘটনাগুলো প্রতিহত করার জন্য যে নৈতিক শক্তির প্রয়োজন ছিল, তা প্রগতিশীলদের ভূমিকার অভাবে সমাজে দৃশ্যমান হয়নি।
এখন সময় হয়েছে আত্মোপলব্ধির। পুরোনো ভার কাঁধে নিয়ে প্রগতিশীল রাজনীতির নতুন কোনো উত্থান সম্ভব নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের মানুষ কোনো ধরনের স্বৈরাচার কিংবা উগ্রবাদকে গ্রহণ করবে না। তারা চায় সাম্য, ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদা। প্রগতিশীলদের যদি টিকে থাকতে হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখতে হয়, তবে তাদের অবশ্যই জনমানুষের ভাষা বুঝতে হবে। কোটারি রাজনীতির মোহ ত্যাগ করে এবং বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতার মানসিকতা পরিহার করে আত্মমর্যাদাবান এক নতুন রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিতে হবে। চব্বিশের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রগতিশীলরা আজ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হয়েছে। যদি তারা নিজেদের গোছাতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল দলগুলোই হারিয়ে যাবে না, পুরো উপমহাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিও এক বড় ধরনের শূন্যতার মুখোমুখি হবে। জনগণের এই জাগরণকে ধারণ করার মতো পরিপক্কতা অর্জন করাই এখন তাদের একমাত্র চ্যালেঞ্জ।