বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৩০ বার
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম শুরু

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রমও আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শুধু তাৎক্ষণিক খাদ্য সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হবে না; বরং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে চাল, রান্না করা খাবার, শুকনো খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ তুলে দেওয়া হয়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আকস্মিক ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। অসংখ্য পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। অনেকের বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, গবাদিপশু এবং জীবিকার বিভিন্ন উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার শুরু থেকেই জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলমান থাকবে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় কাজ করছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সে কারণেই ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। যেসব পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে বা বসবাসের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দিনমজুরদের জীবন-জীবিকা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তাই শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, পুনর্বাসনের মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থান, বসতবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। পুনর্বাসন সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তা দেওয়া হবে।

বন্যার কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, গ্রামীণ রাস্তা ও সংযোগপথ বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলের পাশাপাশি ত্রাণ পরিবহনেও কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত মেরামতের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করা গেলে পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে। কিছু এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন অসংখ্য মানুষ। নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করাও এখন অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা সহায়তা ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কর্মহীন ও গৃহহীন অবস্থায় থাকলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন, জীবিকা পুনর্গঠন এবং ক্ষুদ্র ঋণ বা আর্থিক সহায়তার মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ত্রাণ বিতরণ শেষে অর্থমন্ত্রী পতেঙ্গা থেকে চন্দনাইশের উদ্দেশে রওনা হন। পরে তিনি সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনের কর্মসূচিতে অংশ নেন। এসব এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করে তিনি ক্ষয়ক্ষতির সর্বশেষ চিত্র সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্বাসন পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত করা হবে। অবকাঠামো মেরামত, কৃষি খাত পুনরুদ্ধার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সচল রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনমান দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এই বন্যা আবারও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দুর্যোগ মোকাবিলায় অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নদী ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোও সময়ের দাবি।

সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পৌঁছে দিতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত