প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারত-নির্ভরশীলতা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে। বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলের সন্ধিক্ষণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের বিষয়টি বারবার আলোচনায় উঠে আসে। এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ভারতের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব ও দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর মন্তব্য করেছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদের স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি জামায়াতের রাজনীতি ও আদর্শিক অবস্থানের কথা দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান অনুষ্ঠানের বক্তব্যে ভারতের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে এমন অনেক দল বা নেতা রয়েছেন যাদের বিদেশের মাটিতে বা প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জামায়াতে ইসলামীর এমন কোনো ‘পিসি-খালার দেশ’ নেই, যেখানে প্রয়োজনের মুহূর্তে বা রাজনৈতিক বিপদে আশ্রয় নেওয়া যায়। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত জামায়াতের দেশপ্রেম ও নিজস্ব আদর্শের ওপর অবিচল থাকার বার্তাটি দিতে চেয়েছেন। জামায়াত আমির বলেন, তাঁদের একমাত্র আশ্রয়স্থল হলো বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের অন্তর। এই দেশের মাটির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য এবং এর বাইরে অন্য কোথাও ক্ষমতার চাবিকাঠি বা নিরাপত্তার খোঁজে যাওয়ার প্রয়োজন তাঁরা মনে করেন না।
ভারতের প্রতি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অনেকেই আক্ষেপ করেন যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলকে তাদের মাটিতে আমন্ত্রণ জানালেও জামায়াতে ইসলামীকে সবসময় এড়িয়ে চলেছে এবং এক প্রকার ‘লাল কার্ড’ দেখিয়েছে। তবে এই লাল কার্ডের ব্যাপারে জামায়াত বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নয় বলে তিনি জানান। বরং ভারতের এই বিমাতাসুলভ আচরণ জামায়াতের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ নয় বরং এটি তাদের দৃঢ়তারই প্রমাণ বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ভারত কেন জামায়াতকে পছন্দ করে না বা কেন তাদের কাছে জামায়াত ব্রাত্য, তা তাদের নিজেদেরই বিবেচনার বিষয়। তবে জামায়াত ভারতের বুকে বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তির আশ্রয়ে থেকে রাজনীতি করার চিন্তাও করে না।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি জোরারোপ। তিনি মনে করেন, একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের আস্থা অর্জন করা, কোনো প্রতিবেশী বা বিদেশি শক্তির আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া নয়। জামায়াতের নেতারা অতীতে জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেন। তিনি বলেন, বাইরের কারো পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে দেশের রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। জনগণের ভালোবাসা এবং সমর্থনই যে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি, আর জামায়াতে ইসলামী সেই পথেই হাঁটছে।
অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আন্দোলনে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। এই আবেগময় পরিবেশে ডা. শফিকুর রহমান শহীদ আবু সাঈদসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, যারা নিজের জীবন দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তাদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ভারতের অপছন্দের দল হিসেবে অভিহিত করে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা মূলত তাদের রাজনৈতিক আদর্শকে আরও সুসংহত করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতা ত্যাগ করে দেশীয় জনগণের ওপর আস্থাশীল হতে পারলে দেশের স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য জামায়াতের দীর্ঘদিনের ‘ভারত-বিরোধী’ বা ‘দূরত্ব বজায় রাখা’র যে পরিচিতি রয়েছে, তাকেই আরও জোরালো করেছে। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন জনগণ জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে সচেতন, তখন এই ধরনের বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যারা মনে করেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়, তারা ডা. শফিকুর রহমানের এই সাহসী উচ্চারণের মধ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক বাতাবরণ খুঁজছেন। জামায়াত আমিরের এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মেরুকরণকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য জামায়াতে ইসলামীর একটি নতুন ও সাহসী রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা যে কারো তাবেদারি না করে নিজস্ব আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতিতে টিকে থাকতে চায়, তা আজকের এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের এই অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন নতুন এক মেরুকরণ ঘটছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য রাজনৈতিক সচেতন মহলের নজর এখন জামায়াতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।