প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গ্রামীণ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার সরবরাহের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রান্নার জ্বালানি হিসেবে কাঠ, খড়কুটো, বাঁশ, ঝোপঝাড় ও ঘুঁটের ব্যবহার কমিয়ে আধুনিক, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে শিগগিরই এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জ্বালানি ব্যয় কমাবে না, একই সঙ্গে বন উজাড় রোধ, বায়ুদূষণ হ্রাস, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার রান্নার কাজে কাঠ, খড়কুটো ও ঘুঁটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একদিকে যেমন বনাঞ্চলের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে রান্নাঘরের ধোঁয়ায় নারী ও শিশুরা নানা ধরনের শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ এবং চোখের জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হবে। এর মাধ্যমে নিরাপদ জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে অনেক গ্রামীণ পরিবার এলপিজি ব্যবহার করতে আগ্রহী হলেও বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় তারা নিয়মিত এই জ্বালানি ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে আবারও ঐতিহ্যগত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম সরকারের এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, প্রতিবেশী ভারতেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি দিয়ে এলপিজি সরবরাহ করা হয় এবং সেই কর্মসূচি ইতিবাচক ফল দিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, শুধু গ্রামের দরিদ্র মানুষ নয়, রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বস্তিবাসী এবং নিম্নআয়ের নগরবাসীকেও এই সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ তারাও নিরাপদ জ্বালানির সুবিধা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত।
তিনি আরও বলেন, কর্মসূচির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করার ওপর। এজন্য একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে ভর্তুকি মূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার যাতে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার না হয় কিংবা কালোবাজারে বিক্রি না হয়, সেজন্য কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সরকারের ভর্তুকির সুফল প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এলপিজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১৫ লাখ টনের বেশি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি বাজারজাত করা হয়। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির রান্নার কাজে। এছাড়া শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং অটোগ্যাস হিসেবেও এলপিজির ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে।
বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮ শতাংশ সরবরাহ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারি খাতে সরবরাহ করা হয় মাত্র দুই শতাংশ। সরকারি কোম্পানির সাড়ে ১২ কেজি ওজনের একটি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য দীর্ঘদিন ধরে ৮২৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও এই সুবিধা দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডারের দাম আন্তর্জাতিক বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং বাজার পরিস্থিতির কারণে প্রায়ই ওঠানামা করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় ভোক্তাদের সেই দামে সিলিন্ডার কিনতে হয় না। খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের নতুন ভর্তুকি কর্মসূচি কার্যকর হলে এই মূল্য বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসতে পারে। তবে এর জন্য বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য নির্ধারিত সিলিন্ডার যেন অন্য কোনো খাতে চলে না যায়, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এলপিজির ব্যবহার বাড়লে শুধু মানুষের স্বাস্থ্যই নয়, দেশের পরিবেশও উপকৃত হবে। গ্রামীণ এলাকায় কাঠ সংগ্রহের জন্য বন ও গাছপালার ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। পাশাপাশি রান্নাঘরের ধোঁয়ার কারণে প্রতিবছর যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হন, সেই ঝুঁকিও কমবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ভারতের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য পরিচালিত এলপিজি কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। সেখানে সুবিধাভোগীরা বাজারমূল্যে সিলিন্ডার কিনলেও সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকির অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবেই জমা হয়। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা কালোবাজারির সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশেও যদি একই ধরনের ডিজিটাল ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
অন্যদিকে পাকিস্তানেও শীতপ্রধান ও দুর্গম অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মৌসুমি ভিত্তিতে কম মূল্যে এলপিজি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও তা স্থায়ী কর্মসূচি নয়, তবুও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে প্রস্তাবিত নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং নারীদের দৈনন্দিন জীবন আরও সহজ হবে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সরকারি সূত্র বলছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে সুবিধাভোগী নির্বাচন, ভর্তুকির ধরন, বিতরণ ব্যবস্থা এবং পর্যবেক্ষণ কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচি চালু হলে দেশের লাখো প্রান্তিক পরিবার সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি ব্যবহার করার সুযোগ পাবে এবং নিরাপদ ও আধুনিক জ্বালানির ব্যবহার গ্রামীণ জীবনযাত্রায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।