প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তাল যমুনার করাল গ্রাস যেন বগুড়াবাসীর জীবনের নিত্যসঙ্গী। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে চলা শত শত কোটি টাকার প্রকল্প, হাজার হাজার জিও ব্যাগ এবং অসংখ্য স্পার বা গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণের পরেও এই নদীর ভাঙন থামানো যাচ্ছে না। গত দুই দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও যমুনার অদম্য গতিকে বশে আনা সম্ভব হয়নি। বরং প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই এই নদী যেন নতুন করে সর্বনাশা রূপ ধারণ করে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার মানুষ নদী ভাঙনের বিভীষিকায় বারবার নিঃস্ব হচ্ছে। ফসলি জমি, বসতভিটা আর দীর্ঘদিনের স্মৃতি চিহ্ন মুহূর্তেই নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়া এখন যেন এই অঞ্চলের মানুষের এক কঠিন বাস্তবতা। অথচ এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে গভীর সংশয়।
বগুড়া অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই ৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ১৯ কিলোমিটার এলাকায় তীর রক্ষা বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২৬ কিলোমিটার এলাকা এখনো অরক্ষিত, যা প্রতি মুহূর্তেই নদী ভাঙনের তীব্র হুমকির মুখে থাকে। দীর্ঘ এই সময়ে ছয়টি স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ, দুটি হার্ডপয়েন্টসহ বেশ কিছু কাঠামো নির্মাণ করা হলেও নদীর ভাঙন প্রবণতা কমেনি। বরং নদীর ডান তীরের পাশাপাশি এখন বাম তীরের ভাঙনও সমানতালে বেড়ে চলেছে। নদীর গতিপথের এই অনিশ্চয়তা এবং অপরিকল্পিত তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় মানুষ প্রতিনিয়ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
নদী ভাঙনরোধে বিগত সরকারের আমলে গৃহীত প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন যে, বন্যা মৌসুমে জরুরি কাজের নামে যে বিপুল পরিমাণ সরকারি টাকা খরচ করা হতো, তার একটি বড় অংশই লুটপাট হয়েছে। এক শ্রেণির অসাধু ঠিকাদার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে নামমাত্র কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাগজে-কলমে প্রকল্পের শতভাগ কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে নদী ভাঙন অব্যাহত থেকেছে। যারা একসময় স্বল্প পুঁজি নিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তাদের অনেকেরই এখন অঢেল সম্পদ। অথচ নদীপাড়ের অসহায় মানুষগুলো বারবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব পথে নেমে এসেছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন ভাঙনরোধে নতুন করে একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রায় ২২০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের প্রস্তাবনাটি বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় যমুনা নদীর ডান তীরের সাড়ে নয় কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ, পুরনো বাঁধ মেরামত, ড্রেজিং এবং বিদ্যমান স্পারগুলো পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদি প্রকল্পটি অনুমোদন পায় এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার বিশাল জনবসতি, কৃষি জমি ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে কিছুটা হলেও রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে অতীতে প্রকল্পের নামে দুর্নীতির তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এই নতুন প্রকল্প ঘিরে এলাকাবাসীর মনে চাপা ক্ষোভ ও অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
সম্প্রতি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে যমুনায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ধুনটের শহরাবাড়ি, বানিয়াজান এবং সারিয়াকান্দির কামালপুর এলাকায় বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড তড়িঘড়ি করে ভাঙনকবলিত স্থানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জিও ব্যাগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান যে সম্ভব নয়, তা অতীতের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই প্রমাণিত। এটি কেবল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা যা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে কিন্তু স্থায়ী সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ। প্রকৌশলীরা বলছেন যে, নদীর গতিপথ ও পানির প্রবাহের তীব্রতা এতটাই বেশি যে সাধারণ মেরামত কাজে তা প্রতিরোধ করা কঠিন। তাই নদী শাসনের স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।
প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা পুনর্গঠন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় গণশুনানির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যদি এই প্রকল্পটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে বাস্তবায়ন করা হয়, তবেই হয়তো বগুড়ার মানুষ যমুনার ভাঙন থেকে চিরস্থায়ী মুক্তি পেতে পারে। অন্যথায় বিগত ১৯ বছরের মতো আবারও দেড় হাজার কোটির পরিবর্তে হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাবে, কিন্তু নদী ভাঙনের অট্টহাসি থামবে না।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, নদী রক্ষা প্রকল্পের কাজের ক্ষেত্রে তারা স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন এবং যদি কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু নদীর পাড়ের সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সেই অসাধু সিন্ডিকেটের দিকে, যারা সরকারি টাকায় পকেট ভারী করতে অভ্যস্ত। নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুঁজি করে লুটপাটের এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে যমুনার ভাঙন রোধ করা অসম্ভব। সরকারের উচিত প্রকল্প অনুমোদনের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কাজের মান তদারকিতে নিরপেক্ষ ও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা।
যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে বগুড়ার মানুষের জীবন-জীবিকা গড়ে উঠলেও আজ এটিই তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে যে টেকসই পরিকল্পনার প্রয়োজন, বগুড়ার ক্ষেত্রে তার ঘাটতি রয়েছে। হাজারো পরিবার প্রতিবছর তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে, তাদের এই বেদনা কি কেবল সরকারি প্রজ্ঞাপনেই শেষ? আশা করা যায়, এবারের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রূপ পাবে এবং অবহেলিত বগুড়াবাসীকে নদী ভাঙনের অভিশাপ থেকে স্থায়ী মুক্তি দেবে। নদীর পাড়ের প্রতিটি মানুষ আজ বুক ভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে সেই মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের দিকে।