প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় সরকারি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প—কাবিখা, কাবিটা ও টিআর—এ ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, যা ঘিরে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, স্থানীয়দের প্রতিবাদ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও একটি বেসরকারি অধিকার সংগঠনের বিবৃতি থেকে পাওয়া বিস্তারিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বেসরকারি সংগঠন ‘রাইটস ফর কোস্টাল পিপল (আরসিপি)’ শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান রেদওয়ানুল হক এবং মহাসচিব ইব্রাহীম খলিল সবুজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, চলতি অর্থবছরে চরফ্যাশন উপজেলার কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্পে বরাদ্দের তালিকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরই বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে যে এসব প্রকল্পে প্রকৃত কাজ না করে কাগজে-কলমে কার্য সম্পাদনের কথা দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, জনগণের টাকায় পরিচালিত এসব প্রকল্পে যদি এমন অনিয়ম হয়, তবে তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার চরম ব্যর্থতা। আরসিপি-এর দাবি, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকল্পগুলোতে কী ধরনের কাজ হয়েছে, কোন ঠিকাদার বা সংস্থার মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং প্রকল্পের নির্ধারিত মান ও অগ্রগতি অনুসারে অর্থ ব্যয় হয়েছে কি না—এসব বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।
সংগঠনের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন, যা স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ পেয়েছে। এসব প্রতিবাদে উঠে এসেছে, প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে এবং বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে বলে স্থানীয়দের সন্দেহ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কাবিটা প্রকল্পে মোট ৭৪টি, টিআর প্রকল্পে ৮৫টি এবং কাবিখা প্রকল্পে একাধিক কাজের জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কাজ কতটুকু হয়েছে এবং সে কাজ কতটুকু টেকসই ও প্রয়োজনীয়—তা নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের নামে অর্থ লুটপাটের এই অভিযোগ ঘিরে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। মোবাইল ফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব দেননি, যা প্রশাসনের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
রাইটস ফর কোস্টাল পিপল সংগঠনটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, এ ঘটনাকে যেন নিছক একটি “সাময়িক আলোচিত বিষয়” হিসেবে দেখা না হয়। বরং এসব প্রকল্পে কোন কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তারা জড়িত—তা তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই দেশের দুর্নীতি বিরোধী প্রচার ও সরকারের জবাবদিহিতার দাবির সঙ্গে বাস্তবতা মিলবে।
এ ধরনের অভিযোগ প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতিগ্রস্ত তদারকি ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জনমানসে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন—এমনটাই মত সচেতন নাগরিকদের।
চরফ্যাশনের এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব কেমন করে জনগণের আস্থাকে ক্ষয় করে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন এই সংকটের কী ধরনের জবাব দেয়।