সার্কের সঙ্গে বিমসটেকের তুলনা অযৌক্তিক: মহাসচিব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৫ বার
সার্কের সঙ্গে বিমসটেকের তুলনা অযৌক্তিক: মহাসচিব

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)-এর মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডে বলেছেন, বিমসটেককে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর সঙ্গে তুলনা করা বিভ্রান্তিকর, অযৌক্তিক এবং এটি বিমসটেকের প্রকৃত সক্ষমতা ও স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাঁর মতে, বিমসটেককে অন্য কোনো আঞ্চলিক সংস্থার মানদণ্ডে বিচার না করে এর নিজস্ব লক্ষ্য, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প নেই।

মঙ্গলবার ঢাকায় বিমসটেক সদর দপ্তরে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব)-এর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি বিমসটেকের বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য, ভিসা সহজীকরণ এবং সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ইন্দ্র মণি পান্ডে বলেন, অনেক সময় বিমসটেককে সার্কের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ দুটি সংস্থার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, কার্যপরিধি, কাঠামো এবং কর্মপদ্ধতি ভিন্ন। তাঁর ভাষায়, বিমসটেককে তার নিজস্ব ম্যান্ডেট, কার্যক্রম এবং অর্জনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। অন্য কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের সীমাবদ্ধতা বা অভিজ্ঞতার আলোকে বিমসটেককে বিচার করলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, বিমসটেক বর্তমানে কেবল একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক জোট নয়, বরং এটি বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে সংস্থাটি ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। তাই সদস্য দেশগুলোর উচিত এই প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

মহাসচিব বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার জন্য বিমসটেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশসহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মতো বিভিন্ন খাতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, বর্তমানে বিমসটেকের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের হাতে রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে থাইল্যান্ডের কাছ থেকে বাংলাদেশ এই দায়িত্ব গ্রহণ করে। সভাপতিত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ সংস্থাটিকে আরও কার্যকর, ফলাফলভিত্তিক এবং জনগণকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে।

ইন্দ্র মণি পান্ডে বলেন, বর্তমান নেতৃত্বে বাংলাদেশ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিমসটেক মহাসচিব জানান, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভ্রমণ আরও সহজ করতে একটি ভিসা সহজীকরণ স্কিম নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে ভ্রমণ প্রক্রিয়া সহজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা সহজীকরণ কার্যকর হলে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, গবেষক, পর্যটক এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ হবে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দেবে।

বাণিজ্য সহযোগিতা প্রসঙ্গে মহাসচিব আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী মাস ও বছরগুলোতে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশেষ করে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করছে।

তবে তিনি স্বীকার করেন, এফটিএ নিয়ে আলোচনা একটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এমনকি দুই দেশের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সেখানে সাতটি দেশের স্বার্থ, নীতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা সমন্বয় করে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে স্বাভাবিকভাবেই আরও সময় প্রয়োজন হয়।

বিমসটেক বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ড—এই সাতটি দেশকে একত্রিত করেছে। প্রায় ১৮০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী এই আঞ্চলিক জোট ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

মহাসচিব বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিমসটেক তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে সংস্থার সনদ গ্রহণের পর সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে সহযোগিতার কার্যক্রম সাতটি প্রধান খাতে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি খাতের নেতৃত্ব একটি করে সদস্য রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। এতে দায়িত্ব বণ্টন সহজ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বেড়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে বিমসটেক একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, সমুদ্র অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অবকাঠামোগত সংযোগের মতো বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই জোটের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে বাংলাদেশের সভাপতিত্বে বিমসটেকের কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা। এ প্রেক্ষাপটে সংস্থাটির মহাসচিবের বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিমসটেককে একটি স্বতন্ত্র, কার্যকর এবং ভবিষ্যতমুখী আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন সদস্য দেশগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত