শিল্প উৎপাদনে ৬ বছরের মধ্যে প্রথম নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ৭৬ বার
শিল্প উৎপাদনে ৬ বছরের মধ্যে প্রথম নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল রপ্তানি চাহিদা এবং চড়া ব্যাংক সুদের হারের দীর্ঘমেয়াদী যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অবশেষে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের উদীয়মান শিল্প খাত। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ নানা নীতিগত জটিলতার কারণে বিগত করোনা মহামারীর পর দীর্ঘ ছয় বছর বা ৭২ মাসের দীর্ঘ ব্যবধানে এই প্রথম দেশের কারখানাগুলোতে শিল্প উৎপাদনের গতি মন্থর হয়ে উল্টো ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক সাময়িক উপাত্ত থেকে জানা গেছে যে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়সীমায় দেশের সার্বিক শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ হারে কমে গেছে। অথচ এর ঠিক এক বছর আগে একই সময়সীমায় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনমুখী খাতে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশের একটি সন্তোষজনক ও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল, যা আজকের এই হঠাৎ পতনকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গভীর অশনিসংকেত হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায় যে, এর আগে সর্বশেষ ২০২০ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে যখন বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে কঠোর লকডাউন ও জনজীবন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেই সময় দেশজুড়ে কলকারখানার চাকা বন্ধ থাকায় উৎপাদন একসঙ্গে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। মহামারী পরবর্তী সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার পর বিগত বছরগুলোতে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে নানা ধরনের চড়াই-উতরাই দেখা গেলেও শিল্প খাতের উৎপাদনে এ ধরনের পতন বা সংকোচন আর কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। সাম্প্রতিক এই সংকোচনের শুরুর আগ পর্যন্ত দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির ধারা ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক ছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থবছরের শুরুতে চলা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দেশের ভেতর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে এক ধরনের ‘ধীরে চলো’ বা পর্যবেক্ষণমূলক নীতি এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির জটিলতা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ করা এবং বিদ্যমান ব্যবসা বা কারখানা সম্প্রসারণের মহৎ উদ্যোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করেছে বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষকগণ।

দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবিদদের মতে, শিল্প খাতে ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক সংকোচন কোনো সাময়িক ধাক্কা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত স্থবিরতারই এক অনিবার্য প্রকাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. মো. দ্বীন ইসলাম এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত জোরালোভাবে অভিমত প্রকাশ করে বলেছেন যে, শিল্পের এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির হার একটি স্পষ্ট ও জোরালো সংকেত দিচ্ছে যে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের তীব্র সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন যে, ম্যানুফ্যাকচারিং বা দেশীয় উৎপাদন খাতের এই পতন সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দেশের পণ্য রপ্তানি কমে যাওয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিল্পের এই ভয়াবহ মন্দার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়েছে, যার ফলে বিগত জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির হার নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশে এসে ঠেকেছে, অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশের ঘরে।

শিল্প খাতের এই ধমকে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশের অন্য কোনো প্রধান অর্থনৈতিক খাতও মুক্ত থাকতে পারেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৪ দশমিক ৬১ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে মাত্র ১ দশমিক ৭৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দেশের জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল করে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিও গত বছরের ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে দ্রুত কমে মাত্র ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে এসে পৌঁছেছে, যা মূলত পুরো জাতীয় অর্থনীতির সর্বব্যাপী দুর্বল ও মন্থর চিত্রকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। দেশের বিনিয়োগকারীরা যখন ভবিষ্যতে সরকারি নীতিমালা, রাজস্ব কাঠামো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতের বড় বিনিয়োগগুলো স্থগিত হয়ে যায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে তার ক্ষতিকর প্রতিফলন ঘটে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মনে করেন যে, দীর্ঘমেয়াদী নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহ দেশের ব্যবসায়িক সমাজে এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল, যা উদ্যোক্তাদের বড় সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হতে বাধ্য করেছে।

এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে কেবল নামমাত্র প্রণোদনা প্যাকেজ বা ফাঁকা বুলি আওড়ালে চলবে না, বরং এর বাস্তবভিত্তিক ও সময়োপযোগী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অধ্যাপক ড. মো. দ্বীন ইসলাম আরও উল্লেখ করেছেন যে, উদ্যোক্তাদের শুধু ব্যাংক থেকে ভর্তুকিযুক্ত ঋণ বা অর্থ সহায়তা দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, বরং কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে হলে সর্বাগ্রে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের শতভাগ নিশ্চয়তা এবং একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য কমিয়ে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এমতাবস্থায়, দেশের নীতিনির্ধারক ও সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়া হলে শিল্প খাতের এই রক্তক্ষরণ দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুরো অর্থনীতিকে এক চরম ও অপূরণীয় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

শিল্প খাতের এই নজিরবিহীন ও বড় ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ছাড়াও দেশের ব্যাংক খাতের উচ্চ সুদের হার এবং তারল্য সংকট একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক দফায় দফায় নীতি সুদহার বা পলিসি রেট বাড়িয়ে দেওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এর ফলে ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ—সব ধরনের শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক ও স্থানীয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণের চড়া কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে বহু কারখানা এখন নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে গত কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলেছে, তবুও অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনও তাদের প্রয়োজনমতো কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না। কাঁচামালের এই দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতি এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক বিঘ্নতার কারণে কলকারখানাগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা বা ফুল ক্যাপাসিটিতে উৎপাদন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে, শিল্পের উৎপাদন সূচকগুলোতে লাগাতার পতন দেখা যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তুলছে।

রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক নানা সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বা অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রিলেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং খাতগুলোতে ক্রেতার চাপ এবং কম মূল্যের প্রস্তাবের কারণে উদ্যোক্তারা মার্জিন বা মুনাফা হারাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই বৈরী বাতাবরণের সঙ্গে যখন দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিং এবং মূল্যবৃদ্ধির বোঝা যুক্ত হয়, তখন কারখানা টিকিয়ে রাখাই মালিকদের জন্য প্রধান লড়াই হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র সাময়িক আর্থিক প্রণোদনা বা ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ বা ইজ অব ডুইং বিজনেস সূচকের নাটকীয় উন্নতি ঘটাতে হবে। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং উদ্যোক্তাদের আস্থার সংকট দূর করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যদি দ্রুত এই কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং কর্মসংস্থানের বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com