প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ মুকুট গ্যাঁড়াকলে বন্দি করে দেশের মাটিতে ফিরে এসেছে বিশ্বমঞ্চের বর্তমান সময়ের ‘নতুন’ রাজমুকুটধারী দল স্পেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলের ব্যবধানে পরাস্ত করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সুউচ্চ ট্রফি নিজেদের শোকেসে তোলার পরদিন স্থানীয় সময় সোমবার যখন বিজয়ী বীররা রাজধানী মাদ্রিদের মাটিতে পা রাখেন, তখন পুরো শহরজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও হর্ষোৎফুল্ল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রাজকীয় অভ্যর্থনা, বর্ণাঢ্য রোডশো এবং লাখ লাখ উচ্ছ্বসিত ভক্ত-সমর্থকদের বাঁধভাঙা মাতামাতিতে পুরো মাদ্রিদ শহর যেন রূপ নিয়েছিল এক বিশাল রক্তিম ও লোহিত সাগরের। ফুটবলারদের বরণ করে নিতে সমগ্র শহরটি যেন লাল-হলুদ পতাকার রঙিন চাদরে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিল।
ম্যাচের অতিরিক্ত নির্ধারিত সময়ে দলের অন্যতম সেরা তারকা ফেরান তোরেসের এক ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক জয়সূচক গোলই স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার সুউচ্চ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার গৌরব এনে দেয়। কাঙ্ক্ষিত সেই সোনালি ট্রফি নিয়ে দলের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফদের বহনকারী বিশেষ বিমানটি মাদ্রিদ বিমানবন্দরে অবতরণ করার মুহূর্ত থেকেই পুরো দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বজয়ী বীরদের শুরুতেই অত্যন্ত উষ্ণ ও আন্তরিকতার সঙ্গে বরণ করে নেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘মোনক্লোয়া প্যালেস’-এ আয়োজিত এক বিশেষ ও জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দলের সকল ফুটবলার ও কোচিং স্টাফদের ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন যে, গোটা জাতিকে তারা যে অসাধারণ ও শৈল্পিক ফুটবল উপহার দিয়েছেন, তাদের যে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং যে গৌরবময় বিজয় এনে দিয়েছেন, তার জন্য কোচ ও খেলোয়াড়দের প্রতি তিনি অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন। দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে তাদের এই নান্দনিক খেলা দেখতে পেরে তিনি এবং পুরো দেশ আজ চরমভাবে গর্বিত ও আনন্দিত বলে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রীয় ও রাজকীয় সংবর্ধনার আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হওয়ার পরেই শুরু হয় বিশ্বজয়ী দলকে নিয়ে লাল রঙের এক বিশেষ ও দৃষ্টিিনন্দন ছাদখোলা বাসে বহুল প্রতীক্ষিত ট্রফি প্যারেড বা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ‘স্টারস শাইন টুগেদার’ অর্থাৎ নক্ষত্ররা একসঙ্গে জ্বলে ওঠেছে এই প্রতিপাদ্য স্লোগান এবং দলের প্রধান তারকাদের ছবিসংবলিত সুসজ্জিত ছাদখোলা বাসে চেপে বিশ্বসেরার ট্রফি হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন দলের সফল অধিনায়ক রদ্রি, উদীয়মান বিস্ময়কর তারকা লামিন ইয়ামালসহ স্কোয়াডের ছাব্বিশ জন ফুটবলার। এই ঐতিহাসিক ট্রফি জয়ের শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার সময় দলের সকল খেলোয়াড়ের গায়ে ছিল একটি বিশেষ সংবর্ধনা টি-শার্ট, যার বুকজুড়ে বড় বড় অক্ষরে মুদ্রিত ছিল স্প্যানিশ ভাষায় ‘সোমোস ক্যাম্পিওনেস’ অর্থাৎ আমরাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কথাটি। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে এই বর্ণিল প্যারেডটি যাত্রা শুরু করে ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল মাদ্রিদের সড়ক প্রদক্ষিণ করে অবশেষে গিয়ে পৌঁছায় শহরটির অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত ‘সিবেলেস স্কয়ার’-এ, যেখানে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল।
মাদ্রিদ শহরের স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উৎসবমুখর এই সুদীর্ঘ রাস্তার দুপাশে বিশ্বজয়ী বীরদের একনজর দেখার জন্য এবং ঐতিহাসিক এই উল্লাসে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে প্রায় বিশ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। এর মধ্যে কেবল ঐতিহাসিক সিবেলেস স্কয়ার চত্বরেই অন্তত এক লাখ কুড়ি হাজার ফুটবলপ্রেমী মানুষ একত্রিত হয়ে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা করেছিলেন। সেদিন দুপুরের দিকে আবহাওয়ার তাপমাত্রা প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই করলেও এবং তীব্র গরমের বিকার তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার ভক্ত ছাতা মাথায় দিয়ে সুদূর রোদ উপেক্ষা করে প্রিয় তারকাদের স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অবস্থান নিয়েছিলেন। বিশ্বজয়ীদের এই বর্ণিল সংবর্ধনা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত ও জমজমাট করে তুলতে মঞ্চে একের পর এক জনপ্রিয় সংগীত পরিবেশন করেন দেশের নামকরা শিল্পীরা, যাদের মধ্যে আইতানা, আনা মেনা এবং লোলা ইন্দিগোর মতো বিখ্যাত তারকারা উপস্থিত থেকে দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছিলেন।
প্যারেড আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার ঠিক আগে স্পেনের ফুটবল দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের চরম আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেননি। তিনি অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন যে, এ ধরনের একদল অনুগত ও অনুরাগী ফুটবলপ্রেমী ভক্তদের দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা তাদের কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়দের জন্য অত্যন্ত সম্মানের, গর্বের এবং আবেগের বিষয়। তাঁরা আজ আনন্দে পুরোপুরি আত্মহারা হয়ে আছেন। এবারের এই অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ জয় স্পেনের বর্ণাঢ্য ফুটবল ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এবং এক রক্তিম স্বর্ণালী অধ্যায়ের সংয ঘটিয়েছে। এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবার পুরুষ ফুটবলের বিশ্বজয়ের গৌরব অর্জন করার প্রায় ষোল বছর পর আবারও ফুটবল বিশ্বের চূড়ায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করল দেশটি। তবে ফুটবল ইতিহাসবিদদের মতে, এবারের এই জয়ের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য আগের তুলনায় বহুলাংশে বেশি এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর আগে ২০২৩ সালে স্পেনের নারী ফুটবল দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল, আর ২০২৬ সালে এসে পুরুষ দলের এই বিশ্বজয়ের সুবাদে তারা বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে একই সঙ্গে নারী ও পুরুষ উভয় ক্যাটাগরিতে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল ও অনন্য রেকর্ড গড়েছে।
তবে দেশজুড়ে যখন লাখ লাখ মানুষ এই মহানন্দে ও বিজয়ের উল্লাসে ভাসছিল, ঠিক সেই সময়েই দেশটির সালামানকা শহর থেকে একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক খবর পুরো আনন্দ উৎসবের আবহে কিছুটা হলেও বিষাদের ছায়া নেমে আসে। বিজয়ের উল্লাসের উত্তেজনায় বন্ধুদের একটি দলের সঙ্গে আনন্দ করতে গিয়ে স্থানীয় একটি ঝরনার বিশালাকার স্তম্ভে উঠতে গিয়ে হঠাৎ করেই সেই স্তম্ভটি ভেঙে পড়ে এবং তার নিচে চাপা পড়ে তেরো বছর বয়সি এক কিশোরের অত্যন্ত করুণ মৃত্যু হয়। এই একটিমাত্র অনভিপ্রেত ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি বাদে গোটা স্পেনের আনাচে-কানাচে কেবল খুশির জোয়ার ও উৎসবের দামামা বাজতে থাকে। ২০১০ সালের সেই সোনালি অধ্যায়ের স্মৃতিকে যারা কেবল বইয়ের পাতায় বা প্রবীণদের মুখে শুনে বড় হয়েছে, বর্তমান প্রজন্মের সেই তরুণ ও যুবসমাজ এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন ও জীবন্ত আবেগ অনুভব করার সুযোগ পেয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বসেরার ট্রফি পুনরায় দেশে ফিরে আসায় সিবেলেস স্কয়ারের ঐতিহাসিক ফোয়ারা চত্বর থেকে শুরু করে বিখ্যাত পুয়ের্তা দেল সোল—সবখানেই ফুটবলপ্রেমী মানুষ লাল-হলুদ পতাকা হাতে নিয়ে অবিরাম নাচ-গান ও স্লোগানে স্পেনের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলেছিলেন।
স্পেনের এই মহাকাব্যিক ট্রফি জয়ের পর দেশটির সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এক ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ফুটবল কেবল দেশটির একটি সাধারণ খেলা বা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং স্পেনের সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে এটি অত্যন্ত গভীরভাবে মিশে আছে। বিগত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর স্পেনের এই বিশ্বজয় দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে একতা, আশা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর দারুণ প্রেরণা জুগিয়েছে। রাস্তাঘাটে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ যেভাবে এক হয়ে লাল-হলুদ পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে উৎসবে মেতে উঠেছে, তা প্রমাণ করে যে খেলাধুলা কীভাবে একটি বিভক্ত সমাজকে সুতোয় গেঁথে এক বিন্দুতে নিয়ে আসতে পারে। দেশের তরুণ প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক জয় থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, যা একটি জাতির মানসিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মাদ্রিদের পাশাপাশি বার্সেলোনা, সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া এবং বিলবাওয়ের মতো বড় বড় শহরগুলোতেও বিশ্বকাপ জয়ের পরদিন থেকেই শুরু হয়েছে লাগাতার আনন্দ মিছিল ও কনসার্ট। স্থানীয় রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং শপিং মলগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়, যেখানে সমর্থকরা তাদের প্রিয় খেলোয়াড়দের জার্সি পরে উল্লাসে ফেটে পড়েন। স্পেনের ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, লামিন ইয়ামালের মতো উদীয়মান তরুণ তারকারা বিশ্বমঞ্চে যেভাবে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তা আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলে স্প্যানিশদের আধিপত্য বজায় রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। ফুটবলের এই স্বর্ণালী প্রজন্ম কেবল একটি ট্রফিই জয় করেনি, বরং তারা বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে স্পেনের ঐতিহ্যকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই জয় স্পেনের ঘরোয়া ফুটবল লিগ এবং তৃণমূল স্তরের ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নে আরও বড় বিনিয়োগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে আসতে সাহায্য করবে বলে দেশের ক্রীড়া নীতিনির্ধারকরা আশাবাদী।