প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দলীয় প্রতীক ও দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় আইন অনুযায়ী যোগ্যতা থাকা যেকোনো বৈধ প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলের নামে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হবে আইন অনুযায়ী তাদের বৈধতা ও যোগ্যতা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে বৈঠক করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হলে বিএনপির অবস্থান কী হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দলীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি আলাদা করে দেখার কথা জানান।
মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কারণ এ নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ফলে কোনো দলীয় মনোনয়ন থাকবে না এবং দলীয় প্রতীকও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা পূরণ করলে এবং তার প্রার্থিতা বৈধ হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
তার বক্তব্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কাঠামো এবং জাতীয় পর্যায়ের দলীয় রাজনীতির মধ্যে একটি পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। দলীয় প্রতীকভিত্তিক নির্বাচন না হওয়ায় কোনো প্রার্থীকে শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্বাচনী আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনা করা হবে—এমন অবস্থানই প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তবে একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম যে পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকবে না, সেটিও স্পষ্ট করেছেন তিনি। মীর শাহে আলম জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে প্রার্থী দেবে না। তবে স্থানীয়ভাবে দল সমর্থিত প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের বিএনপি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে একজন সমর্থিত প্রার্থী ঠিক করে দিতে পারে। দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকেও স্থানীয় বিএনপিকে প্রতিটি ইউনিয়নে একক সমর্থিত প্রার্থী রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় কাঠামোর বাইরে হলেও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ও সমর্থন পুরোপুরি বাদ যাচ্ছে না। দলীয় প্রতীক না থাকলেও কোনো প্রার্থীকে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থিত ব্যক্তি হিসেবে স্থানীয় ভোটারদের সামনে তুলে ধরা হতে পারে। ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইউনিয়ন, উপজেলা ও অন্যান্য স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত। স্থানীয় সড়ক, অবকাঠামো, জনসেবা, উন্নয়ন কার্যক্রম, নাগরিক সুবিধা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা জড়িয়ে থাকে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন জনগণের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীদের নিরাপত্তা, প্রচার-প্রচারণার সুযোগ এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি কোনো আলাদা অবস্থান নেবে না। সরকারের দায়িত্ব হবে নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা।
মীর শাহে আলম বলেন, দলীয়ভাবে নির্বাচন হচ্ছে না। বৈধ প্রার্থী হিসেবে যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তারা যাতে সঠিকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন সহযোগিতা করবে।
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সরকারের এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রশাসনের দায়িত্বের বিষয়টিও সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালন করবে, আর প্রশাসন কমিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করবে—এমন কাঠামোর কথাই জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এতে নির্বাচনী কার্যক্রমে প্রশাসনের ভূমিকা কীভাবে পরিচালিত হবে, তার একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা চালানোর সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থীরা সাধারণত সরাসরি ভোটারদের কাছে গিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ভোটারদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও অনেক বেশি প্রত্যক্ষ হয়। ফলে কোনো প্রার্থী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা অন্য কোনো কারণে প্রচারের ক্ষেত্রে বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচনী পরিবেশের অন্যতম শর্ত।
একই সঙ্গে প্রার্থীদের বৈধতা নির্ধারণে আইন ও নির্বাচন কমিশনের বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একজন প্রার্থীর সম্পৃক্ততা থাকলেও তার প্রার্থিতা আইন অনুযায়ী বৈধ কি না, সেটিই আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রধান বিবেচ্য হওয়ার কথা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই আইনগত কাঠামোর ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যক্রম নিয়ে দেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়তে পারে। তবে দলীয়ভাবে নির্বাচন না হওয়ায় কোনো দলের নামে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকবে না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয়ভাবে সমর্থিত প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ নির্বাচনের মাঠে দলটির সাংগঠনিক উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আনছে। একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সে কারণে প্রতিটি ইউনিয়নে একক সমর্থিত প্রার্থী রাখার জন্য দলের পক্ষ থেকে চেষ্টা করার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বেশি বিস্তৃত ও অংশগ্রহণমূলক হবে, তত বেশি প্রার্থীদের মধ্যে জনসম্পৃক্ততা ও স্থানীয় ইস্যু নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। তবে সেই প্রতিযোগিতা যেন শান্তিপূর্ণ থাকে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না পায়, সেটিও প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় দায়িত্ব।
ভোটারদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারেন। স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রার্থীর স্থানীয় ভূমিকা অনেক সময় ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তাই ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
সচিবালয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে। দলীয় নির্বাচন না হওয়ায় রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন ও প্রতীক থাকছে না। তবে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে এবং আইন অনুযায়ী বৈধ সব প্রার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।
এখন নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, নির্বাচনী তফসিল, প্রার্থী যাচাই-বাছাই এবং মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কার্যক্রমের দিকে নজর থাকবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা কীভাবে নির্বাচনী মাঠে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে একটি বিষয় স্পষ্ট—দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একেবারে অনুপস্থিত থাকবে না। আইন অনুযায়ী বৈধ প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে এবং প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা ও প্রচার-প্রচারণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং মাঠপর্যায়ে ভোটাররা কতটা স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারেন, সেটিই হবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বড় পরীক্ষা।