পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার
পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আরও সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ। সংস্থাটির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইয়ংবিয়নে নতুন একটি ভবন নির্মাণের বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। ওই ভবনে বিপুলসংখ্যক সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্যাটেলাইট চিত্র, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি এবং অন্যান্য উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে আইএইএ এসব তথ্য পেয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল আগের সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং দেশটি অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

উত্তর কোরিয়ার প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ইয়ংবিয়নে নতুন যে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে সর্বোচ্চ ২৮টি সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড স্থাপনের সুযোগ থাকতে পারে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সেন্ট্রিফিউজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এসব যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত ক্যাসকেডের মাধ্যমে ইউরেনিয়ামের নির্দিষ্ট আইসোটোপের ঘনত্ব বাড়ানো হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সামরিক ব্যবহারের উপযোগী উপাদান তৈরির ক্ষেত্রেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গুরুত্বপূর্ণ।

আইএইএর পর্যবেক্ষণে ইয়ংবিয়নে এটিকে দ্বিতীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০৯ সালে উত্তর কোরিয়া আইএইএর পরিদর্শকদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার পর সরাসরি পরিদর্শনের সুযোগ হারায় সংস্থাটি। এরপর থেকে স্যাটেলাইট চিত্র ও অন্যান্য উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

চলতি বছরের জুনের শুরুতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন ওই স্থাপনা পরিদর্শন করেন। তার পরিদর্শনের সময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করে আইএইএ নতুন স্থাপনাটির বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর মাধ্যমে স্থাপনাটির সম্প্রসারণ ও সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কিম জং-উন ওই স্থাপনা পরিদর্শনের সময় দাবি করেছিলেন, গত পাঁচ বছরে অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের সক্ষমতা উত্তর কোরিয়া দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দেশের পারমাণবিক শক্তি আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজ ইয়ংবিয়নের সম্ভাব্য ২৮টি ক্যাসকেডে প্রায় ৪ হাজার ৫৯২টি সেন্ট্রিফিউজ থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। ওই হিসাব অনুযায়ী, স্থাপনাটি বছরে প্রায় ৮৫ কেজি অস্ত্র তৈরির উপযোগী উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে। এই পরিমাণ উপাদান দিয়ে আরও কয়েকটি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির সুযোগ থাকতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।

তবে উত্তর কোরিয়ার প্রকৃত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের আকার বা বর্তমানে তাদের হাতে ঠিক কত পরিমাণ অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মূলত স্যাটেলাইট চিত্র, রাষ্ট্রীয় ঘোষণাসহ উন্মুক্ত তথ্য এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের মধ্যেও পার্থক্য দেখা যায়।

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাংসন ও ইয়ংবিয়নে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের সক্ষমতাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়া সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। একই বছর দেশটি একাধিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে। এরপরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন ও পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পিয়ংইয়ং।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক আগস্টে জানিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই হিসাব বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী নিজস্বভাবে ওই সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি। একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা ৫৭ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এসব ভিন্ন হিসাবই বোঝায়, উত্তর কোরিয়ার প্রকৃত পারমাণবিক সক্ষমতা নির্ধারণ করা কতটা জটিল।

উত্তর কোরিয়া নিজেকে বৈধ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। দেশটির নেতৃত্বের বক্তব্যে বারবারই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পারমাণবিক অস্ত্রকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে।

বিশেষ করে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং পাল্টাপাল্টি কঠোর বক্তব্যের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রায়ই অস্থির হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর মতো তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির সবচেয়ে বড় মানবিক ও নিরাপত্তাগত আশঙ্কা হলো সম্ভাব্য ভুল হিসাব বা সংঘাতের ঝুঁকি। কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলেও এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি সেই ঝুঁকিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য তাই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ শুধু অস্ত্রের সংখ্যা গণনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করার প্রশ্ন। উত্তর কোরিয়া যদি সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা আরও বাড়াতে থাকে, তাহলে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য সক্ষমতাও একই সঙ্গে বাড়তে পারে।

ইয়ংবিয়ন ও কাংসনের কার্যক্রম নিয়ে আইএইএর নতুন পর্যবেক্ষণ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। যদিও স্যাটেলাইট চিত্র বা উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর কোরিয়ার সামগ্রিক পারমাণবিক সক্ষমতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়, তবু নতুন স্থাপনা নির্মাণ ও বিদ্যমান কার্যক্রম সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

সব মিলিয়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি এখনো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশটির নেতৃত্ব যদি অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও কঠিন প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। সেই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং আলোচনার প্রয়োজনীয়তাও আরও বাড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত