এনবিআরের ই-রিটার্ন চালু: করদাতাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ বার
এনবিআরের ই-রিটার্ন চালু: করদাতাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা

প্রকাশ: ২২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল ও বেগবান করতে এবং সাধারণ করদাতাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করে কর প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ আধুনিক, সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ব্যক্তিশ্রেণির ই-রিটার্ন সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। করসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক এই ধারাবাহিকতায় বুধবার থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই কার্যক্রম দেশব্যাপী শুরু হয়েছে, যা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এক নতুন ও যুগান্তকারী দিগন্তের সূচনা করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক দায়িত্বশীল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ও ঝামেলাহীন করার এই মহতী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ২০২১ সালে যখন দেশে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের এই আধুনিক পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, তখন থেকেই দেশের সচেতন নাগরিক ও করদাতাদের মধ্যে এটি ব্যাপক কৌতূহল ও ইতিবাচক সাড়া জাগিয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় এবং সেবার মান উন্নত হওয়ার ফলে বিগত ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে দেশের ইতিহাসে এক অভাবনীয় ও রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটে, যেখানে প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা চিরাচরিত কাগজের ফাইলের ঝামেলা এড়িয়ে পরম স্বস্তিতে এই ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমেই সফলভাবে তাদের বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন করেছিলেন। করদাতাদের এই অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করার আগ্রহ দিন দিন বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে এখন থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তের করদাতারা কোনো ধরনের দপ্তরে বা সার্কেল অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে না দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নিজের ঘরের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসে তাদের বার্ষিক আয়কর রিটার্ন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করতে পারবেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা অনলাইনে জমা দিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন।

সাধারণ করদাতাদের জন্য এই ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও সুদৃঢ় ও সার্বজনীন করার উদ্দেশ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ আদেশ জারি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের সকল স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সমাজের কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের কথা সংবেদনশীলভাবে বিবেচনা করে এই বাধ্যতামূলক নিয়ম থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট ছাড় বা অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে, যাতে বয়োবৃদ্ধ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোনো নাগরিককে অযথা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে না হয়। বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেসব সম্মানিত করদাতার বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি অর্থাৎ প্রবীণ নাগরিকরা চাইলে আগের মতো পেপার রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। পাশাপাশি, চিকিৎসকের সনদপত্র দাখিল সাপেক্ষে শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতারা, জীবিকা বা অন্য কোনো কারণে বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী করদাতারা, মৃত করদাতার আইনি প্রতিনিধি কিংবা বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মরত কোনো বিদেশি নাগরিক অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করার পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী পেপার রিটার্ন দাখিলের সুবিধা বহাল রাখবেন। এছাড়া, ই-রিটার্ন সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন সংক্রান্ত কোনো জটিল ও অনিবার্য সমস্যার কারণে যদি অন্য কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দাখিলে সরাসরি সমর্থ না হন, তবে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত বা যুগ্মকর কমিশনারের বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে তারা পেপার রিটার্ন দাখিলের সুযোগ পাবেন।

ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর পরিশোধের প্রক্রিয়াটিকেও অত্যন্ত সহজ ও বহুমুখী করা হয়েছে, যাতে দেশের যেকোনো কোণ থেকে মানুষ খুব সহজেই তাদের করের টাকা পরিশোধ করতে পারেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিজস্ব অফিসিয়াল পোর্টালের মাধ্যমে করদাতারা অত্যন্ত নিরাপদ উপায়ে ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড কিংবা দেশের জনপ্রিয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ বা অন্য যেকোনো অনুমোদিত মাধ্যম ব্যবহার করে ঘরে বসেই তাদের নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে পারবেন। এর পাশাপাশি, করদাতারা সঠিক ও নির্ভুল তথ্য প্রদান করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজেদের রিটার্ন প্রস্তুত করতে পারবেন, অনলাইনে তা সফলভাবে জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাৎক্ষণিকভাবে অফিশিয়াল প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বা রসিদ এবং মূল আয়কর সনদ সংগ্রহ করার সুযোগ পাবেন, যা তাদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কাজে অত্যন্ত জরুরিভাবে ব্যবহৃত হবে।

অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের এই নতুন প্রক্রিয়ায় কোনো করদাতা যদি কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত জটিলতা বা সমস্যার মুখোমুখি হন, তবে তা দ্রুত নিরসন করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তা দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সরকারি ছুটি বা বাদে সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে অফিস চলাকালীন সময়ে করদাতারা সুনির্দিষ্ট কল সেন্টারে যোগাযোগ করে এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমের সহায়তায় অভিজ্ঞ রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সমাধান ও সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। বিশেষ করে, ২০২৬-২০২৭ করবর্ষ থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য একটি দারুণ আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা করদাতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে বিশেষভাবে উৎসাহিত করবে। প্রতিবছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে যারা তাদের আয়কর রিটার্ন সফলভাবে দাখিল করবেন, তারা নিট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিশেষ প্রণোদনা বা নগদ ছাড় লাভ করবেন। নির্ধারিত এই সময়সীমার পর রিটার্ন দাখিল করলে এই বিশেষ প্রণোদনা আর প্রযোজ্য হবে না এবং ডিসেম্বরের পরবর্তী সময়ে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর বা জরিমানা প্রদেয় হতে পারে। এমতাবস্থায়, যেকোনো ধরনের বাড়তি ঝামেলা এড়াতে এবং আর্থিক প্রণোদনা উপভোগ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে দেশের সকল সম্মানিত করদাতাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তাদের বার্ষিক আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এই ডিজিটাল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, করদাতাদের এখন আর কোনোভাবেই সরকারি দপ্তরে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। কর প্রদানের এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ কাগজবিহীন হওয়ায় পরিবেশের যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি দুর্নীতি বা হয়রানির সুযোগও একবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দেশের তরুণ ও প্রবীণ উভয় প্রজন্মের জন্যই এই প্ল্যাটফর্মটি অত্যন্ত উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সীমিত হলেও কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন।

গত বছরের বিশাল সাফল্যের পর এনবিআর আশা করছে যে, এবারের করবর্ষে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জন করতে এই ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সঠিক সময়ে রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমেই কেবল একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত