আপিল বিভাগে বিচারপতি সংকট, রাষ্ট্রপতিকে শিশির মনিরের চিঠি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
আপিল বিভাগে বিচারপতি সংকট, রাষ্ট্রপতিকে শিশির মনিরের চিঠি

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বাধীন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অঙ্গন তথা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মামলার পাহাড় ও বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রতার অসহনীয় জট দ্রুত নিরসনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এক সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপে দেশের বিচারব্যবস্থায় অভূতপূর্ব গতি আনার জোরালো দাবি উঠেছে। দেশের বিচারাধীন মামলার ক্রমবর্ধমান বিশাল জট কমানোর অত্যন্ত কার্যকর ও আশু উপায় হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগের সুনির্দিষ্ট আবেদন জানিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যসমৃদ্ধ অফিসিয়াল চিঠি প্রেরণ করেছেন দেশের সুপরিচিত ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট অঙ্গনে এই চিঠি পাঠানোর সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের আইন অঙ্গন, সুশীল সমাজ এবং বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কারের দাবিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির কর্তৃক মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরিত ওই ঐতিহাসিক চিঠিতে দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসের অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ তুলনামূলক চিত্র এবং পরিসংখ্যান অত্যন্ত নিখুঁত ও প্রামাণ্য উপায়ে তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে নির্দেশিত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যখন ১৯৭২ সালে তার শুভযাত্রা শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক সময়ে দেশের আপিল বিভাগে মাত্র চারজন বিচারপতিকে নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সে সময় গোটা দেশের সার্বিক জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ছয় কোটি তেতাল্লিশ লাখের কাছাকাছি এবং তার বিপরীতে সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার মোট সংখ্যা ছিল মাত্র চার হাজারের মতো, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের জনসংখ্যার অবিরাম ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক নানা বিরোধের ফলে মামলাজট যেভাবে পাহাড়সম আকার ধারণ করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আপিল বিভাগের কাঠামোগত সক্ষমতা বা বিচারকের সংখ্যা সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি।

চিঠিতে উপস্থাপিত অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও প্রামাণ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা স্ফীত হয়ে প্রায় সতেরো কোটি একাশি লাখে উন্নীত হয়েছে, অথচ এর বিপরীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগে বর্তমানে কর্মরত বিচারপতির সংখ্যা মাত্র আটজনে সীমিত রয়েছে। জনসংখ্যা ও মামলার অনুপাতে বিচারকের এই চরম স্বল্পতার কারণে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় আটত্রিশ হাজার ১৭টিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা দেশের বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের ভাগ্যে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে সুদূরপরাহত করে তুলেছে। চিঠিতে আরও দেখানো হয়েছে যে, বিগত ২০০৯ সালেও আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১১ জন এবং সেই সময়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৬৩টি। এরপর ২০১১ সালে বিচারপতির সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে ১০ জন করা হলেও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ১২ হাজার ৮৯১টিতে পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা কমে ৯ জনে নেমে এলেও মামলার জট বেড়ে গিয়ে ১৬ হাজার ৫৭৮টিতে পৌঁছায় এবং ২০২২ সালে এসে সেই মামলার সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৯২৮টিতে উন্নীত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিচারপতির সংখ্যা মাত্র ৮ জনে সীমিত থাকা সত্ত্বেও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা রেকর্ড ভেঙে ৩১ হাজার ১২০টিতে গিয়ে পৌঁছায়, যা দেশের বিচার বিভাগের ওপর এক অকল্পনীয় ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে।

চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, বর্তমান আধুনিক ও জটিল যুগে আইনের বিভিন্ন নতুন শাখায় বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব দিন দিন বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেওয়ানি, ফৌজদারি, সাংবিধানিক ও বাণিজ্যিক আইনের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে সুনির্দিষ্ট ও বিশেষজ্ঞ বিচারক বা বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠন করা বর্তমান সময়ের অত্যন্ত জরুরি দাবি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আপিল বিভাগে বিচারপতির তীব্র ও চরম স্বল্পতা থাকার কারণে কোনোভাবেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না, যার প্রত্যক্ষ কুফল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর নিষ্পত্তি চরমভাবে বিলম্বিত হচ্ছে এবং বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের সাধারণ মানুষ যখন তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে সর্বোচ্চ আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন এই দীর্ঘসূত্রতা তাদের মনে আইনের শাসন সম্পর্কে এক ধরনের হতাশা ও আস্থার সংকট তৈরি করছে, যা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না।

প্রতিবেশী ও বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র ভারতের বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে চিঠিতে অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার দ্রুত ও নির্বিঘ্নে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি গত ২০২৬ সালের ১৬ মে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধিসংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি করেছে। ওই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের অনুমোদিত বিচারপতির সংখ্যা ৩৪ জন থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৩৮ জনে উন্নীত করা হয়েছে, যাতে দেশের কোনো নাগরিককে মামলার জটের যাতাকলে পিষ্ট হতে না হয়। ভারতের ন্যায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিচারপ্রার্থীদের মৌলিক অধিকার ও দ্রুত ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে। চিঠির একেবারে শেষাংশে বিচারাধীন মামলার এই পাহাড়সম জট কমিয়ে একটি গতিশীল, স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সরাসরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত