প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতিগুলো সংরক্ষণে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সময়ের সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে আসা দেয়ালচিত্রগুলোর মূল বার্তা, শিল্পরীতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে আগামী ২৬ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে পুনরায় রংকরণ ও পুনর্লিখন কার্যক্রম। এই উদ্যোগকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যাঁরা এসব গ্রাফিতি এঁকেছিলেন, তাঁদের পাশাপাশি আগ্রহী শিল্পী ও শৌখিন শিল্পীদেরও অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৬ জুলাই সকাল থেকে উপাচার্য ভবন থেকে রোকেয়া হল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় গ্রাফিতির রংকরণ ও পুনর্লিখনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। দেয়ালচিত্রগুলোর শিল্পমান, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রতীকী গুরুত্ব যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়ের প্রভাবে অনেক গ্রাফিতির রং ফিকে হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ক্ষয়ও দেখা দিয়েছে। তাই মূল শিল্পকর্মের ভাব, ভাষা ও নান্দনিকতা বজায় রেখেই সেগুলো নতুন করে সংরক্ষণ করা হবে। প্রশাসনের আশা, এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি আরও দীর্ঘস্থায়ীভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
রংকরণ কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চারুকলা অনুষদের ডিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালককে। তাঁরা শিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। বিশেষ করে যাঁরা আন্দোলনের সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রাফিতি অঙ্কনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্পকর্মের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও বার্তা অক্ষুণ্ন থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, রংকরণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী শিল্পী ও শৌখিন শিল্পীদের আগামী ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে নাম ও ঠিকানা দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের সমন্বিতভাবে কাজের সুযোগ করে দেওয়া হবে। এতে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিতিগুলো নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ নয়, বরং সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে আগামী ২৬ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টায় বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ : ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যাশা, এ সেমিনারে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানা দিক নিয়ে গবেষণাভিত্তিক আলোচনা হবে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে নতুন চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি হবে।
মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন আবাসিক হলেও স্মৃতিচারণা, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, কুইজ, রচনা প্রতিযোগিতা ও মোমবাতি প্রজ্বালনের মতো নানা আয়োজন করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী ছাত্রী নিবাসে স্মৃতিচারণা, রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।
এ ছাড়া অমর একুশে হল আগামী ১ আগস্ট আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। কবি সুফিয়া কামাল হলে ৩০ জুলাই মোমবাতি প্রজ্বালন এবং ৩১ জুলাই স্মৃতিচারণা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, জগন্নাথ হল ও শামসুন নাহার হলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আলোচনা সভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, কুইজ এবং স্মৃতিচারণামূলক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ‘জুলাই স্মৃতিকথন’ শীর্ষক একটি বিশেষ সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বিজয় একাত্তর হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, রোকেয়া হল এবং ড. কুদরাত-ই-খুদা হোস্টেলও পৃথকভাবে জুলাইকে স্মরণ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রাফিতি শুধু দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি নয়; এগুলো একটি সময়ের ইতিহাস, প্রতিবাদ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের দৃশ্যমান দলিল। তাই এগুলোর সংরক্ষণ কেবল শিল্পকর্ম রক্ষার উদ্যোগ নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে রাখার প্রচেষ্টা। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং গণমানুষের দাবিগুলো এসব গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল। ফলে এগুলোর মৌলিক রূপ সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ গবেষণা ও ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই উদ্যোগকে অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে শুধু বইয়ের পাতায় নয়, দৃশ্যমান শিল্পকর্মের মাধ্যমেও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে নতুন প্রজন্ম অতীতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বাস্তবধর্মী ধারণা লাভ করতে পারে এবং ইতিহাসের সঙ্গে আবেগগত সংযোগও তৈরি হয়।
আগামী ২৬ জুলাই শুরু হতে যাওয়া রংকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে ছড়িয়ে থাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মারক গ্রাফিতিগুলো নতুন প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাসব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের ইতিহাস, শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।