শিল্পকলায় আজ রুনা লায়লার ঐতিহাসিক একক সংগীতসন্ধ্যা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
শিল্পকলায় আজ রুনা লায়লার ঐতিহাসিক একক সংগীতসন্ধ্যা

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের ইতিহাসে আজ যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি বিশেষ অধ্যায়। উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা ছয় দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য সংগীতজীবনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে একক সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বহুল প্রতীক্ষিত আয়োজন। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য দেশি-বিদেশি মঞ্চে পরিবেশনা করলেও শিল্পকলার এই একক অনুষ্ঠান তাঁর ক্যারিয়ারের একটি ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি পারিবারিক কাজে এক মাসেরও বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান শেষে দেশে ফিরেছেন রুনা লায়লা। দেশে ফিরেই বিশ্রামের পরিবর্তে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এই বিশেষ আয়োজনের প্রস্তুতিতে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, শুধু একটি কনসার্ট নয়, বরং এটি হবে বাংলাদেশের সংগীত ঐতিহ্য, শিল্পীর দীর্ঘ সাধনা এবং শ্রোতাদের সঙ্গে তাঁর গভীর আবেগের এক অনন্য মিলনমেলা।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজন ঘিরে সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ একাধিক ভাষায় অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দেওয়া রুনা লায়লা এই প্রথম শিল্পকলার মঞ্চে একক পরিবেশনা করছেন। দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা সময়ের শ্রোতাপ্রিয় ও কালজয়ী গান দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন এদিনের পরিবেশনা। আয়োজক সূত্র জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর ৬২ বছরের পেশাদার সংগীতজীবনের প্রতিনিধিত্বকারী অন্তত ১০টি জনপ্রিয় গান পরিবেশন করবেন।

অনুষ্ঠানটি নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রুনা লায়লা বলেন, শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি, গান এবং অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে অতীতে দু-একবার গান গাওয়ার সুযোগ হলেও পূর্ণাঙ্গ একক সংগীতানুষ্ঠান এবারই প্রথম। শ্রোতাদের সঙ্গে একটি সুন্দর, আবেগঘন এবং স্মরণীয় সন্ধ্যা কাটানোর প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে রুনা লায়লা শুধু একজন সফল শিল্পীর নাম নয়; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। ষাটের দশকে পেশাদার সংগীতজীবন শুরু করে তিনি দ্রুতই দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর কণ্ঠে আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, গজল, লোকগান, নজরুলসংগীত কিংবা দেশাত্মবোধক গান—প্রতিটি ধারাই পেয়েছে আলাদা মাত্রা। কয়েক প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে তাঁর গান সমানভাবে জনপ্রিয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন শিল্পীরা এলেও রুনা লায়লার গ্রহণযোগ্যতা কখনো কমেনি।

দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের সংগীতকে পরিচিত করে তুলতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একাধিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন।

আজকের অনুষ্ঠানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে একটি মানবিক উদ্যোগ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সংগীতানুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রদান করা হবে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং মানবিক সহমর্মিতারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। শিল্পের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগকে ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে রুনা লায়লাকে বিশেষ সম্মাননাও প্রদান করা হবে। বাংলাদেশের সংগীতে তাঁর দীর্ঘ অবদান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। এর আগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি একই ধরনের বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আব্দুল হাদীকেও সম্মান জানিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সম্মানিত হচ্ছেন রুনা লায়লা।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগীতের ধরন ও শ্রোতাদের অভ্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন রুনা লায়লার মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের সরাসরি পরিবেশনা নতুন প্রজন্মকে দেশের সংগীত ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত কালজয়ী গানগুলো শুধু বিনোদনের উৎস নয়, বরং বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদ।

রুনা লায়লার এই একক আয়োজন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। বহু ভক্ত ও অনুরাগী জানিয়েছেন, তাঁরা এই অনুষ্ঠানকে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, শিল্পকলা একাডেমির মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মঞ্চে রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠান অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও এমন একটি আয়োজন বাস্তবায়িত হওয়ায় তাঁরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

ঢাকার এই আয়োজন শেষ করেই আবারও আন্তর্জাতিক ব্যস্ততায় ফিরবেন রুনা লায়লা। চলতি মাসের শেষ দিকে তাঁর অস্ট্রেলিয়া সফরের সূচি রয়েছে। সেখানে একাধিক শহরে প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতাদের জন্য বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজকদের আশা, বিদেশের মঞ্চেও তিনি বাংলাদেশের সংগীতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরবেন।

সংগীতজীবনের ৬২ বছর অতিক্রম করেও রুনা লায়লার কণ্ঠের আবেদন, মঞ্চে উপস্থিতি এবং সংগীতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা আজও অনুপ্রেরণার প্রতীক। প্রজন্ম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, সংগীতের পরিবেশ বদলেছে; কিন্তু শ্রোতাদের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান একই রকম উজ্জ্বল। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এই একক সংগীতানুষ্ঠান তাই কেবল একটি কনসার্ট নয়, বরং দেশের সংগীত ইতিহাসে এক কিংবদন্তির দীর্ঘ পথচলার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সম্মানের এক স্মরণীয় আয়োজন হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত