এআই চিপ বাজারে চীনের উত্থান, বদলাচ্ছে বৈশ্বিক সমীকরণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
এআই চিপ বাজারে চীনের উত্থান, বদলাচ্ছে বৈশ্বিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্ফোরণ বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের চিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে মেমোরি চিপের চাহিদা নজিরবিহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান—চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) এবং ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিস কোম্পানি (ওয়াইএমটিসি)। একসময় সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিষ্ঠান এখন শুধু চিপ উৎপাদনেই নয়, মূল্য নির্ধারণেও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। এমনকি চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানকেও আগের তুলনায় বেশি দামে চিপ কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।

শুক্রবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, স্মার্টফোন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থায় মেমোরি চিপের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সিএক্সএমটি ও ওয়াইএমটিসি নিজেদের বাজার অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিএক্সএমটি সম্প্রতি টিকটকের মালিক প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের একটি বিশাল চুক্তি করেছে। এর আগে চীনের আরেক প্রযুক্তি জায়ান্ট টেনসেন্টের সঙ্গে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সরবরাহ চুক্তিও সম্পন্ন করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব চুক্তি শুধু তাদের আর্থিক সক্ষমতাই বাড়াচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক মেমোরি চিপ বাজারে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের মেমোরি চিপ নির্মাতাদের প্রভাব ছিল সীমিত। কিন্তু দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি বিনিয়োগ, সরকারি সহায়তা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের বিশাল চাহিদা এখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে তারা শুধু চীনের বাজার নয়, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সিএক্সএমটি আগামী কয়েক বছরে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা মাইক্রনকে ছাড়িয়ে যাওয়া। যদি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বৈশ্বিক মেমোরি চিপ বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

চীনের প্রযুক্তি শিল্পে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো, স্থানীয় নির্মাতারা এখন শুধু বিদেশি প্রযুক্তির বিকল্প নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই বাজারের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুয়াওয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানকেও প্রয়োজনীয় মেমোরি চিপ সংগ্রহে আগের তুলনায় বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, সরবরাহকারীর অবস্থান থেকে সিএক্সএমটি ও ওয়াইএমটিসি এখন শক্তিশালী দরকষাকষির অবস্থানে পৌঁছে গেছে।

তবে এই দ্রুত অগ্রযাত্রার মধ্যেও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং কয়েকটি পশ্চিমা দেশের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির লিথোগ্রাফি যন্ত্রপাতি সংগ্রহে সীমাবদ্ধতার কারণে অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তারা এখনো দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নির্মাতাদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

বর্তমানে সিএক্সএমটি ও ওয়াইএমটিসি মূলত নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের তুলনামূলক কম উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। ফলে সর্বাধুনিক মেমোরি চিপ উৎপাদনে তাদের সক্ষমতা সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত এই ব্যবধান দূর করতে গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

এদিকে এআই প্রযুক্তির বিস্তার বিশ্বজুড়ে চিপ শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। ওপেনএআই, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফটসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপ ব্যবহার করছে। ফলে চিপ নির্মাতাদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হবে সবচেয়ে কৌশলগত খাতগুলোর একটি। এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, রোবোটিকস এবং স্মার্ট ডিভাইসের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মেমোরি চিপের চাহিদা আরও বাড়বে। তাই এই বাজারে যে দেশ প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব অর্জন করবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তবে চীনের দ্রুত অগ্রগতি এই প্রতিষ্ঠিত সমীকরণকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। যদিও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনো কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে চীনা নির্মাতারা, তবুও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের বিশাল চাহিদা তাদের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সরবরাহ চেইনের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে এই শিল্প বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, চীনের সিএক্সএমটি ও ওয়াইএমটিসির উত্থান কেবল দুটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এআই বিপ্লবের এই সময়ে মেমোরি চিপ শিল্পে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারের প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত