দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট বিতর্ক, তদন্তের দাবি জোরালো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট বিতর্ক, তদন্তের দাবি জোরালো

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ছররা গুলি বা পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ। একদিকে একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা নথিতে বিক্ষোভকারীদের শরীরে পেলেটের আঘাতের উল্লেখ পাওয়া গেছে, অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে। ফলে ঘটনাটি এখন শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০ জুলাই রাজধানীর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের পাশাপাশি পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনডিটিভির হাতে আসা সফদরজং হাসপাতালের একটি চিকিৎসা নথিতে ২৮ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর শরীরে পেলেটের আঘাতের উল্লেখ রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তির ডান কনুই ও পিঠে পেলেটের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ক্ষতের চারপাশে কালচে দাগ, তীব্র ব্যথা এবং শরীরে গুলির ক্ষুদ্র ধাতব অংশ আটকে থাকার প্রমাণও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে আহতদের মধ্যে সাহিল লোচাব নামে এক বিক্ষোভকারীর ডান চোখে ছররা গুলি লাগার অভিযোগও সামনে এসেছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর চোখে ইতোমধ্যে একটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও একটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। একই ঘটনায় শেখ মনসুরি নামে আরেক আন্দোলনকারীর মুখমণ্ডলে একাধিক পেলেটের আঘাতের অভিযোগও উঠে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে দিল্লি পুলিশ। তাদের দাবি, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পেলেট গান ব্যবহারের খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত আইনানুগ পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়েছে এবং পেলেট ব্যবহারের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে সাধারণত সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) বিশেষ পরিস্থিতিতে পেলেট গান ব্যবহার করে থাকে। ২০ জুলাইয়ের ওই বিক্ষোভে দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি আরএএফ সদস্যরাও মোতায়েন ছিলেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সিআরপিএফ আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে ঘটনায় ঠিক কোন বাহিনী কী ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে, সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট ব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীও ছাত্র আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পরিবর্তে কঠোর বলপ্রয়োগ গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ঘোষণা দেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি নতুন আইন আগামী সপ্তাহে সংসদে উত্থাপন করা হবে। সরকারের দাবি, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে আরও কঠোর আইনি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত। যদি চিকিৎসা নথিতে উল্লেখিত তথ্য সঠিক হয়, তবে পেলেট ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের অস্বীকার এবং আহতদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে, তা নিরসনে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তাই এ ধরনের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত হলে জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে।

দিল্লির এই ঘটনাকে ঘিরে এখন রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে। চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থানের মধ্যে যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, তা দূর করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত