ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল ইরান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ মূল বিরোধের কোনো সমাধান প্রস্তাবে না থাকায় কেবল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগও আপাতত কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্যের বরাতে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) জানিয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি তেহরানে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইরানি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেন। সংশ্লিষ্ট ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এটিই সংঘাত নিরসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব।

তবে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার পর ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক বিরোধগুলোর সমাধান ছাড়া কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তেহরানের দৃষ্টিতে সংঘাতের মূল কারণ অমীমাংসিত রেখে কেবল অস্ত্রবিরতি কার্যকর করলে তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না।

তেহরান সফরের সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, চলমান সংঘাত এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ওয়াশিংটন সফরের অভিজ্ঞতা এবং সেখানে অনুষ্ঠিত আলোচনার বিষয়বস্তু ইরানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর জন্য স্বাভাবিক কূটনৈতিক দায়িত্বের অংশ। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমান সংকটের মূল সমস্যা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান।

আরাঘচির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর অযৌক্তিক চাপ, আধিপত্যবাদী নীতি এবং একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সেই নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।

এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি রেলপথ, বিমানবন্দর, সেতু এবং সমুদ্রবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।

অন্যদিকে ইরানও পাল্টা জবাব হিসেবে পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এতে অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের দুই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তেহরান অথবা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নতুন করে হামলা চালায়, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাদের দাবি, সে ক্ষেত্রে ইরান শুধু ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে হামলার মাত্রা বাড়াবে না, বরং ইয়েমেনের মিত্র হুথি গোষ্ঠীর সহায়তায় লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে নৌ চলাচল সীমিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই দুটি সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে। ফলে এসব এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। যদিও বিভিন্ন দেশ সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে মূল বিরোধগুলো নিয়ে উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক পথের নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং পারস্পরিক আস্থার সংকটসহ বৃহত্তর রাজনৈতিক বিষয়গুলোর সমাধান প্রয়োজন। অন্যথায় অস্থায়ী সমঝোতা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। দুই পক্ষের অবস্থান এখনো কঠোর থাকায় সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত