প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষার্থীদের সংসদ অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর পেলেট বা ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জাতীয় গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে তীব্র আলোচনা চললেও এবার প্রাথমিক তদন্তে পেলেট ব্যবহারের তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কে বা কার নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধাসামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ)-এর এক সদস্য শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে অন্তত সাতটি পেলেট কার্টিজ নিক্ষেপ করেছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ছোড়া সাতটি পেলেটের মধ্যে দুটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও পাঁচটি আন্দোলনকারীদের শরীরে আঘাত করে। যদিও সিআরপিএফ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি কিংবা এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য দেয়নি।
গত কয়েক দিন ধরেই আহত শিক্ষার্থীদের শরীরে পেলেটের চিহ্ন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আহতদের ছবি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও ঘটনাটিকে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছেন। বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এক আহত শিক্ষার্থীকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, আহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে এবং বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ঘটনার পর রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি জানতে চান, শিক্ষার্থীদের ওপর পেলেট গুলি চালানোর নির্দেশ কে দিয়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এমন কোনো নির্দেশ না দিয়ে থাকেন, তাহলে কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় পুলিশের সঙ্গে সাধারণ পোশাকে যেসব ব্যক্তি লাঠিচার্জ ও হামলায় অংশ নিয়েছিলেন, তারা কারা এবং কী পরিচয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন—সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি। পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ওই চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ করেন রাহুল গান্ধী।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন দমনে অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে হবে। বিরোধী নেতাদের মতে, গণতান্ত্রিক দেশে শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, বিতর্কের শুরুতে দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল, তারা কোনো ধরনের পেলেটগান ব্যবহার করেনি। এরপরই প্রশ্ন ওঠে, আহতদের শরীরে পাওয়া পেলেট কোথা থেকে এলো। এই পরিস্থিতিতে সিআরপিএফ র্যাফকে নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তের প্রাথমিক তথ্যই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত মন্তব্য থেকে বিরত রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সংসদ অভিযান শেষ হয়ে আন্দোলনকারীরা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলেও উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে কিংবা সরকারের সমালোচনায় দেওয়া পোস্টগুলোকেও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আপত্তিকর বলে বিবেচিত কিছু পোস্ট ও ভিডিও অপসারণের জন্য নোটিশ পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
ছাত্রনেতারা আন্দোলন চলাকালে দায়ের করা সব মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের ভাষ্য, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মৌখিকভাবে ইতিবাচক আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দেশনা পায়নি। ফলে মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বহাল রয়েছে।
এদিকে উত্তর প্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্যে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গাজিয়াবাদে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। যদিও স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না পাওয়ায় তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সময়ে আরও একজন ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনকারীদের বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করায় পুলিশ পরিচয়ে কিছু লোক তাকে আটক করে অন্যত্র নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে বিরোধী দলগুলো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছে, অন্যদিকে সরকারপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকার কথা বলছে। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে কে বা কার নির্দেশে এই শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। এরই মধ্যে বিষয়টি ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে এবং দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের নীতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।