প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য অবস্থান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া দুই রাজনৈতিক শক্তি এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আলাদা কৌশলে এগোচ্ছে—এমন ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে জামায়াতের পক্ষ থেকে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সাবেক ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার খবর রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে, এর আগেই একই পদে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। ফলে একসময়কার জোটসঙ্গী দুই দলের সম্ভাব্য মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক রাজনৈতিক সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই জামায়াত ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাদিক কায়েমকে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে এনসিপিও আগেই আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠপর্যায়ে প্রচারণার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শেষ পর্যন্ত দুই দল কি একই প্রার্থীকে সমর্থন করবে, নাকি আলাদাভাবে নির্বাচন করবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু একটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জোট, বিরোধী রাজনীতির কৌশল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সমঝোতার দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। কারণ, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জোটগত সমন্বয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত দুই দলের অবস্থান ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এনসিপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, দলটি এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাই করতে চায়। সংসদ নির্বাচনে সীমিতসংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় তৃণমূল সংগঠন অনেক এলাকায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়নি বলে দলের নেতাদের ধারণা। তাই এবার দেশের অধিকাংশ সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভায় নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কৌশল নিয়েছে এনসিপি। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মার্চ মাসে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়, যেখানে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে জাতীয় পরিচিতি লাভ করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের তিন ছাত্র উপদেষ্টার একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে সরকারি দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে এনসিপিতে যোগ দেন এবং বর্তমানে দলের মুখপাত্র ও নীতিনির্ধারকদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১০ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করেননি।
এনসিপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা দাবি করেছেন, সংসদ নির্বাচনের সময় আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আপত্তি ছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে জামায়াত সমর্থন দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিল। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি জামায়াতে ইসলামী। এনসিপির আরেকটি সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে আসিফ মাহমুদের অবস্থান দলটির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবে সেই বিষয়গুলো কী ছিল, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে সাদিক কায়েমকে সামনে আনার বিষয়টি অনেক আগেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিল বলে জানা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাদিক কায়েম ছাত্ররাজনীতিতে পরিচিত মুখ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণায় অংশ নেন। গত ২২ জুন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি আনুষ্ঠানিকভাবে সাদিক কায়েমকে প্রার্থী ঘোষণা করে, তাহলে এটি কার্যত স্পষ্ট করবে যে দলটি ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দিচ্ছে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে তফসিল ঘোষণার আগে কিংবা নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা বা আসনবিন্যাসের ঘটনা নতুন নয়।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর মতে, যদি রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন হয় যে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধী শক্তির বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়বে, তাহলে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আলোচনায় বসতে পারে। তবে বর্তমানে প্রতিটি দলই নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে এনসিপির নেতাদের যোগাযোগ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি আসিফ মাহমুদের সঙ্গে মামুনুল হকের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আলোচনা হয়েছে। যদিও উভয় পক্ষই এটিকে নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবু ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। কারণ খেলাফত মজলিস, জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসিফ মাহমুদ নিজেও সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো রাজনৈতিক বোঝাপড়া হতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস। তাঁর মতে, সেই সমঝোতা জোটগত নাও হতে পারে; বরং নির্দিষ্ট এলাকায় নির্বাচনী সমর্থনের ভিত্তিতেও হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এনসিপির লক্ষ্য হলো দেশের অন্তত ৭০ শতাংশ এলাকায় নিজেদের প্রার্থী দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।
এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধু একটি স্থানীয় নির্বাচন নয়; বরং এটি দেশের বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কৌশল, জোট রাজনীতি এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতারও একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে। সাদিক কায়েম ও আসিফ মাহমুদ—দুজনই তরুণ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং উভয়েরই নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থন রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত দুই দলের মধ্যে সমঝোতা, প্রার্থী পরিবর্তন কিংবা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে ঢাকা দক্ষিণে জামায়াত ও এনসিপি একই মঞ্চে থাকবে নাকি আলাদা পথে হাঁটবে। আপাতত দুই দলই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যস্ত থাকলেও রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ সিটিকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।