প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেনীর সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালানবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশে আনা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি, চকলেট এবং এসব পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত একটি মিনি ট্রাক জব্দের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে সীমান্তপথে সক্রিয় চোরাচালান চক্রের তৎপরতা। বিজিবির দাবি, নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার ফলে চোরাচালানকারীদের বড় ধরনের একটি চালান জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। জব্দ হওয়া মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য ৬৮ লাখ ২৫ হাজার ৯৫০ টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ে ফেনী সীমান্ত এলাকায় পরিচালিত উল্লেখযোগ্য জব্দ অভিযানের অন্যতম।
সোমবার (২৭ জুলাই) ফেনী জেলার ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযান চালায় ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর বিশেষ টহল দল। বিজিবি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয় এবং সম্ভাব্য চোরাচালান রুটগুলোতে বিশেষ টহল মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে সীমান্ত অতিক্রম করে আনা ভারতীয় পণ্যের একটি বড় চালান দেশের অভ্যন্তরে পাচারের প্রস্তুতির তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি ও চকলেট উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে এসব পণ্য বহনের কাজে ব্যবহৃত একটি মিনি ট্রাকও জব্দ করা হয়।
বিজিবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তের বিভিন্ন অরক্ষিত ও দুর্গম পথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র ভারতীয় পণ্য দেশে নিয়ে আসে। পরে স্থানীয় বিভিন্ন স্থানে মজুত রেখে সুযোগ বুঝে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে উৎসব মৌসুম কিংবা বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির সময় এসব পণ্যের অবৈধ সরবরাহ আরও বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে চোরাচালানকারীরা প্রায়ই গভীর রাত কিংবা ভোরের সময় সীমান্ত অতিক্রম করে এবং স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার হওয়ায় এমন অনেক চালান আগেই শনাক্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শাড়ি, প্রসাধনী, চকলেট, কসমেটিকস, তৈরি পোশাক, মাদকদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে আনা-নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকে। এসব পণ্যের বড় একটি অংশ বৈধ শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই দেশের বাজারে প্রবেশ করায় সরকার রাজস্ব হারায়। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েন। ফলে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান দমন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও বৈধ বাণিজ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজিবি জানিয়েছে, জব্দ হওয়া মালামালের আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় শাড়ি, চকলেট এবং মিনি ট্রাক স্থানীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তীতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জব্দকৃত পণ্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এই চালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। অভিযানের সময় চোরাচালানকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাদের পরিচয় ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে বিজিবি নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ফেনী সীমান্তের বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করছে বাহিনীটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় অপরাধ দমনে স্থানীয় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তঃসংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা এবং মাদকসহ সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে ফেনী ব্যাটালিয়ন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত অভিযান এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে বিজিবি বদ্ধপরিকর এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং কিছু দুর্গম এলাকা চোরাচালানকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদার হওয়ায় চোরাচালানের অনেক বড় চালান আটক করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পণ্য যেমন শাড়ি, কসমেটিকস, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য অবৈধভাবে দেশে প্রবেশের প্রবণতা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও মনে করছেন, সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ফলে চোরাচালান কার্যক্রম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে অপরাধচক্র প্রায়ই নতুন কৌশল গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানোর চেষ্টা করে। সে কারণে টেকসইভাবে চোরাচালান রোধে নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পণ্য প্রবেশ বন্ধ করা গেলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি সীমান্তকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। এ কারণে বিজিবির চলমান অভিযানকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফেনী সীমান্তে পরিচালিত সর্বশেষ এই অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে যে, তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতা, নিয়মিত টহল এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে চোরাচালান চক্রের বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে ভবিষ্যতেও তাদের অভিযান আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার জনগণকে যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতার তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।