বিশ্ব বাজারে দর কমলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দ্বিগুণ দামে তেল কিনছে ভারত — কৌশল নাকি কূটনীতি?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
  • ১৫০ বার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে, রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুবাদে ভারত পাচ্ছেও তুলনামূলক সস্তায় তেলের সরবরাহ। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাশিয়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে অপরিশোধিত তেল কেনায় ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা একে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ এবং ‘বাণিজ্যনীতির বিচ্যুতি’ বলেই অভিহিত করছেন।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা এবং ভারতীয় জ্বালানি ও বাণিজ্য দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী জানা গেছে, ভারত জুন ও জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গড়ে ৮৩ ডলার দরে কিনেছে। অথচ একই সময়ে রাশিয়া থেকে সেই তেল কেনা হয়েছে গড়ে ৪৩ ডলার প্রতি ব্যারেল দরে। অর্থাৎ প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৪০ ডলার বেশি দামে তেল আমদানি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যা সবমিলিয়ে কয়েক কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের এমন সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সামরিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের যে প্রক্রিয়া চলছে, তাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘তেল-বাণিজ্য’ দিয়ে মজবুত করার কূটনৈতিক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তেল কেনার এই প্রবণতা নেহায়েতই বাজারভিত্তিক নয় বরং বড় অংশে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় প্রভাবিত—এমনটাই ধারণা বিশ্লেষকদের।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ ভারত গত এক দশকে ক্রমশ রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ভারত বিপুল পরিমাণে সাশ্রয়ী দামে রুশ তেল কিনেছে, যা দেশটির জ্বালানি খাতে ব্যয় হ্রাস এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার চাপ ছিল রাশিয়ার জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিমা উৎসে ঝুঁকে পড়ার।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে অতিমূল্য দিয়ে তেল কেনা অনেকের কাছে একধরনের চাপের ফল হিসেবেই ধরা হচ্ছে। আবার অনেকেই মনে করছেন, এটি ভারতের একটি ব্যালান্সিং কৌশল—যেখানে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেই পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে কৌশলগত বোঝাপড়াকে তীব্র বিরোধে না পরিণত করে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস রয়েছে।

ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয় যদিও এখনো এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি, তবে অভ্যন্তরীণভাবে বলা হচ্ছে, “বিভিন্ন উৎস থেকে তেল আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখা ও রিজার্ভ বাড়ানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য”। কিন্তু এই যুক্তি সাধারণ বিশ্লেষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে না, কারণ একই সময়েই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ার পরও এত বেশি দামে আমদানি করাকে অর্থনৈতিক অদূরদর্শিতা বলে মনে করছেন তারা।

তেল আমদানির এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা। অতিরিক্ত দামে তেল আমদানি করার অর্থ হলো, সরকারকে তেলের ভর্তুকিতে বাড়তি ব্যয় করতে হতে পারে অথবা সেই ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। এর ফলেই ঘরোয়া বাজারে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফলে দেশের ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে সরাসরি বোঝা।

বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি কূটনীতির বিশেষজ্ঞ ড. অনুরাধা সেন মনে করেন, “ভারতের এই সিদ্ধান্ত মূলত বড় পরিসরে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রচেষ্টা। কিন্তু সেটি যদি দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।”

সামগ্রিকভাবে এই ঘটনাটি আবারও তুলে ধরেছে আধুনিক জ্বালানি রাজনীতির জটিল বাস্তবতা। যেখানে কেবল বাজারের চাহিদা বা দাম নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য, কূটনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের মতো বিষয়গুলোও একটি দেশের জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারত যদি এমন ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত সিদ্ধান্ত নিয়ে চলতে থাকে, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দিশা ঠিক কোন দিকে এগোচ্ছে? আদৌ কি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে? এখন ভারতের জন্য সময় এসেছে—শুধু বন্ধুত্ব নয়, জনগণের স্বার্থেই হিসাব-নিকাশে আরও স্বচ্ছ হতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com