প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং শত শত বিদেশি নিখোঁজ হওয়ার পরও পর্যটকদের দেশটি ভ্রমণে নিরুৎসাহিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। দেশটির পর্যটনমন্ত্রী খড়গ রাজ পাওদেল বলেছেন, ভয়াবহ দুর্যোগে অনেক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নেপালের বহু জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এখনো নিরাপদ এবং পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
ফেসবুকে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় পর্যটনমন্ত্রী পর্যটকদের উদ্দেশে বলেন, নেপালের পাহাড়ি পথ ও ট্রেকিং রুটগুলো এখনো তাঁদের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি পর্যটকদের নেপাল ভ্রমণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সময়ে দেশটিতে আসা শুধু ছুটি কাটানোর বিষয় নয়; বরং ভয়াবহ দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করা নেপালের অর্থনীতিকে সহায়তা করারও একটি উপায়।
পর্যটনমন্ত্রী তাঁর বার্তায় ‘#নেপাল কলিং’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্যোগের কারণে পুরো নেপালকে পর্যটনের জন্য অনিরাপদ মনে করার প্রবণতা ঠেকানো এবং যেসব পর্যটন এলাকা স্বাভাবিক রয়েছে, সেগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের আসতে উৎসাহিত করা।
গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাম, সড়ক ও সেতু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশটির পর্যটনশিল্পেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা সরাসরি দুর্যোগের কবলে পড়েনি এবং সেখানে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে, তবু বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহ ছবি এবং প্রাণহানির খবর বিদেশি পর্যটকদের নেপাল সফরের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকার।
দুর্যোগের প্রভাব শুধু পর্যটন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। নেপালের অর্থনীতির ওপরও এর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, পর্যটন খাতের সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দেশটিকে এখন বড় ধরনের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
গত সপ্তাহে একটি হিমবাহ ধসে বরফ, কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত একটি উপত্যকার দিকে নেমে আসে। এতে পথে থাকা বসতি, সড়ক ও সেতু ধ্বংস বা ভেসে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে পানির ভয়াবহ স্রোতে ভবন, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ, পাথর ও যানবাহন ভেসে যেতে দেখা গেছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩৯টি দেশের প্রায় ৫৯০ জন বিদেশি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের পর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত দেশটিতে দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে নেপালের পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ দলও কাজ করছে। কয়েক শ শ্রমিক এখনো বিভিন্ন টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। তাঁদের উদ্ধারে জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও উদ্ধারকারীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং জানিয়েছেন, উদ্ধারকারীরা একটি টানেলের ওপরের অংশে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। এখন তাঁরা পাওয়ারহাউসের ওপর থেকে নিচের দিকে খনন করে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তিনি জানিয়েছেন, আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
দুর্যোগে নেপালের অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নেপালের ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, নুওয়াকোট ও রাসুয়া জেলায় অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি দেশের অর্থনীতি ও শিল্প কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা বিবেচনায় পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য নেপালের উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও কঠিন সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভিন্ন এলাকার মানুষকে হেলিকপ্টার ও অন্যান্য উড়োজাহাজের মাধ্যমে উদ্ধার করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ৯৯৩ জনকে দুর্গত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগের কারণে অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতেই পর্যটকদের নেপাল ভ্রমণের আহ্বান জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যটকদের আগমন শুধু হোটেল, রেস্তোরাঁ, গাইড, পরিবহন ও ট্রেকিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের আয় ধরে রাখতে সহায়তা করবে না; বরং পর্যটননির্ভর অর্থনীতির ওপর আস্থা ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখবে।
নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। পাহাড়ি ট্রেকিং, হিমালয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক দেশটিতে যান। দুর্যোগের কারণে পর্যটকদের ব্যাপকভাবে সরে দাঁড়ানো হলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও আয় কমে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও নিরাপদ পর্যটন অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
তবে পর্যটকদের নেপাল সফরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগের পরও উদ্ধার অভিযান চলছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে।
সরকারের বার্তাটি মূলত এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন নেপালকে একদিকে ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার প্রয়োজন রয়েছে। পর্যটন খাত স্বাভাবিক রাখা গেলে তা স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা করতে পারে। আর নিরাপদ ও চালু থাকা পর্যটন এলাকাগুলোকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে দেশটি দুর্যোগ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি পথও তৈরি করতে চাইছে।