প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ আট সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ বিষয়ে জারি করা রুলের শুনানি শেষে মামলাটি আট সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন আদালত।
বুধবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, প্রকল্প পরিচালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতের আগের নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগে করা আদালত অবমাননার মামলা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা রিটের শুনানি শেষে আদালত এই নির্দেশনা দেন।
বেলার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী। আদালতে তিনি বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ হিসেবে ঘোষিত। এই এলাকায় বড় ধরনের নির্মাণকাজ শুরুর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শুধু ল্যান্ড ইউজের অনুমতি নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন বলে তিনি আদালতকে জানান।
আইনজীবী মিনহাজুল হক আরও বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী সমুদ্রসৈকতের ৩০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ। এর পরও সৈকতের বালিয়াড়ির ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের কাজ চালানো হচ্ছে।
মামলার অপর পক্ষের আইনজীবী হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতে বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দখল এবং সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের জন্য ২০১০ সালে জনস্বার্থে রিট করা হয়েছিল। সেই মামলার শুনানি শেষে ২০১১ সালে হাইকোর্ট সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা এবং বালিয়াড়িতে নির্মিত সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালতের ওই নির্দেশের পর দুই দফায় বালিয়াড়িতে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার পৌরসভা বালিয়াড়ির ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তাঁর মতে, এভাবে নির্মাণকাজ চালানো হলে সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তা আদালতের আগের নির্দেশনারও পরিপন্থী হবে।
এর আগে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কক্সবাজারের বালিয়াড়িতে নির্মাণকাজ চলার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর এ ঘটনায় আদালত অবমাননার মামলা করে এইচআরপিবি। একই ঘটনায় প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে বেলা হাইকোর্টে রিট আবেদন করে।
বুধবারের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী।
কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্প্রতি শুরু করে কক্সবাজার পৌরসভা। প্রকল্পটির আওতায় বালিয়াড়ির একটি অংশে মাটি ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে কাজ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল।
পরিবেশবাদীদের আপত্তির মূল বিষয় হলো সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি। উপকূলীয় এলাকায় বালিয়াড়ি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, বরং সামুদ্রিক ঢেউ ও ঝড়ের প্রভাব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এসব এলাকায় বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরও আপত্তি জানিয়েছে। সংস্থাটির কক্সবাজার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত সমুদ্রসৈকতে বড় ধরনের সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এই অবস্থান প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, অন্যদিকে পরিবেশ আইনজীবী ও সংগঠনগুলো সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
হাইকোর্টের আট সপ্তাহের নির্দেশের ফলে আপাতত বালিয়াড়িতে চলমান নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে হবে। একই সময়ে মামলার পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত প্রকল্পটির আইনগত ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় আদালতের বিবেচনায় থাকার সুযোগ তৈরি হলো।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক পর্যটক এই সৈকতে ভিড় করেন। সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ, বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় ভূপ্রকৃতি পর্যটন আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
বেলার আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসিএ এলাকায় বড় নির্মাণকাজের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিষয়টি আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে থাকা পক্ষের বক্তব্য আদালতের সামনে রয়েছে। ফলে আগামী শুনানিতে প্রকল্পটির অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং আগের আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে এর সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে।
হাইকোর্টের এই আদেশের মাধ্যমে অন্তত আগামী আট সপ্তাহের জন্য কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ বন্ধ থাকছে। একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানিতে প্রকল্পটির আইনগত বৈধতা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে।