সর্বশেষ :

বর্ষার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
বর্ষার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ষা এলেই দেশের নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনে শুরু হয় নতুন আতঙ্ক। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও প্রবল স্রোত, কোথাও ঘূর্ণিপাক, আবার কোথাও তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে ধসে পড়ছে নদীর পাড়। চোখের সামনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান নদীভাঙনে নতুন করে বাস্তুহারা হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ।

বান্দরবানের আলীকদম থেকে বরিশালের বাবুগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে কুড়িগ্রামের রাজারহাট—বর্ষার পানি ও প্রবল স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীভাঙনের ঝুঁকি। কোথাও জিও ব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে, আবার কোথাও স্থানীয় মানুষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু নদীভাঙনের শিকার মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ একটাই—পরবর্তী মুহূর্তেই হয়তো তাদের শেষ সম্বলটুকু নদীগর্ভে চলে যাবে।

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় মাতামুহুরী নদী ও চৈক্ষ্যং খালের ভাঙনে আতঙ্কে রয়েছেন নদী ও খালপাড়ের মানুষ। আলীকদম সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাবের মিয়াপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। একইভাবে চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মংচিং হেডম্যানপাড়ার কাছের চৈক্ষ্যং খালেও পানি বাড়লেই শুরু হয় তীরভাঙন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমের শুরু ও শেষের দিকে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পানির প্রবল স্রোতে নদী ও খালের পাড় ধসে পড়ে। ভাঙন ঠেকাতে অতীতে কয়েক দফায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রতি বছর নতুন করে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানোর আশঙ্কায় থাকতে হয় নদী তীরবর্তী পরিবারগুলোকে।

ছাবের মিয়াপাড়া এলাকায় প্রায় ৩০০ মিটার নদীতীর রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। কিন্তু প্রবল স্রোতের কারণে এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। চৈক্ষ্যং খালের মংচিং হেডম্যানপাড়া এলাকাতেও এর আগে ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চৈক্ষ্যং খালের প্রায় ৮০ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় তীররক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুটি স্থানে জিও ব্যাগভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, সাময়িক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।

বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানিয়েছেন, বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলে তীর রক্ষার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে ব্লক দিয়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে স্থায়ী কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলাতেও নদীভাঙনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। রহমতপুর ও চাঁদপাশা ইউনিয়নের সংযোগ সড়ক এবং মীরগঞ্জ বাজারসংলগ্ন বেড়িবাঁধ নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাঁধের আরও অংশ নদীতে বিলীন হতে পারে।

এই সড়কটি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে এ পথ ব্যবহার করেন। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও নিয়মিত এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুই ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে সড়ক ও বেড়িবাঁধের একটি অংশ ধসে পড়েছে। আশপাশের কৃষিজমি এবং বসতবাড়িও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এদিকে পদ্মার তীব্র ভাঙনে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পশ্চিম গাঁওদিয়া এলাকায়। নদীর পানি বৃদ্ধি, প্রবল স্রোত এবং ঘূর্ণিপাকের কারণে সেখানে নদীতীর ধসে পড়ছে। ভাঙনের মুখে পড়ে শতাধিক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয়দের অনেকে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। নদীর পাড়ের কাছাকাছি থাকা পরিবারগুলোর জন্য প্রতিটি দিন যেন নতুন এক উদ্বেগ নিয়ে আসে। সকালে যে জমি বা বাড়ির জায়গা নিরাপদ দেখা যায়, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেটিই নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নদীতীরের প্রায় ২০০ ফুট এলাকা ভেঙে গেছে। এতে আশপাশের বসতবাড়ি, সড়ক ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ঝুঁকিতে পড়েছে। পদ্মার স্রোতের তীব্রতার কারণে নদীর তলদেশেও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

গাঁওদিয়া ইউনিয়নের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ভাঙনের ভয়াবহতার কথা জানিয়েছেন। নদীর পাড়ের যে অংশ কিছু সময় আগেও শুকনো ছিল, সেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর পানি দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলে আপাতত ভাঙনের গতি কমানোর চেষ্টা চলছে।

লৌহজং পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, পদ্মার মতো বড় নদীর তীব্র ভাঙন মোকাবিলায় সাময়িক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ব্লক ও শক্তিশালী নদীতীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

অন্যদিকে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট এলাকায় তিস্তার পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ক্রস বাঁধের সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বাঁধ ও সড়কের দুই পাশে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তিস্তা তীরবর্তী মানুষের কাছে নদীভাঙন একটি পরিচিত কিন্তু ভয়াবহ বাস্তবতা। নদীর পানি বাড়লেই বসতবাড়ি ও জমি হারানোর শঙ্কা ফিরে আসে। বুড়িরহাট এলাকার বাসিন্দারাও আশঙ্কা করছেন, দ্রুত প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়া না হলে বাঁধের আরও অংশ ভেঙে যেতে পারে।

কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি এবং স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা। স্থানীয় কৃষকদের অনেকেই বলছেন, নদীভাঙনের আতঙ্ক শুধু জমি হারানোর ভয় নয়; এটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেয়।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, খবর পাওয়ার পর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পানি বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ এই ভাঙন শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এই চিত্র আবারও সামনে আনছে নদীভাঙন সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজনীয়তা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও অনেক এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

নদীভাঙনে শুধু জমি বা ঘর হারায় না মানুষ। হারিয়ে যায় একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, জীবিকার উৎস এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। নতুন জায়গায় গিয়ে শুরু করতে হয় অনিশ্চিত জীবন।

নদী তীরবর্তী মানুষের দাবি, ভাঙন শুরু হওয়ার পর শুধু জরুরি পদক্ষেপ নয়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে আরও বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের জন্য প্রতিটি বর্ষাই যেন নতুন এক পরীক্ষার সময়। তাদের একটাই প্রত্যাশা—নদীর সঙ্গে লড়াইয়ে তারা যেন একা না থাকে এবং শেষ ভিটেমাটিটুকু রক্ষায় রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ দ্রুত তাদের পাশে দাঁড়ায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত