সর্বশেষ :

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‘বিরোধী দল দমনের চক্রান্ত’: এনসিপি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‘বিরোধী দল দমনের চক্রান্ত’: এনসিপি

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এনসিপি অভিযোগ করেছে, বর্তমান কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে ফেলা এবং বিরোধী দল দমনের পুরোনো কৌশল আবারও সামনে আনা হচ্ছে।

বুধবার রাতে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন বর্তমান দুর্নীতি দমন কমিশনের নৈতিক ও আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের দাবি, জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী কমিশন পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অনুসন্ধানকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বলা সম্ভব নয়।

এর আগে বুধবার দুপুরে দুদকের এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর কথা জানানো হয়। বিষয়টি প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে অনুসন্ধান শুরুর প্রাথমিক পর্যায়েই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বক্তব্য এবং পরে সেই বক্তব্যের ভাষা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।

এনসিপির অভিযোগ, অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদকের একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমের সামনে অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় ওই শব্দবন্ধ ব্যবহার না করার অনুরোধ জানানো হয় বলে দলটির নেতারা দাবি করেছেন। এনসিপির মতে, এই ঘটনাই কমিশনের বক্তব্য, পদ্ধতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার আগেই এমন ভাষা ব্যবহার করা হলে তা তদন্তাধীন ব্যক্তির অধিকার ও জনমতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই কমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন এনসিপির নেতারা।

‘দুদককে পুনরায় বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার করার অপচেষ্টা এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ’ শীর্ষক বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সরকারি পর্যায়ের প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠলেও সেসব ক্ষেত্রে দুদকের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন যদি সবার জন্য একই মানদণ্ডে কাজ না করে, তাহলে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এনসিপির ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে।

বিবৃতিতে এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণের অধিকার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে সক্রিয় রয়েছে, তখন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থার অনুসন্ধান শুরু হওয়াকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার প্রবণতা আবারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তবে এনসিপির এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে এসেছে এবং আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন—এমন নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ধরনের অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হয়।

এনসিপি দাবি করেছে, অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। দলটির নেতাদের ভাষ্য, দুর্নীতি দমন কমিশনকেও অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন।

নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের অভিযোগ, বর্তমান কমিশনের গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের দাবি, কমিশনকে এমন একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, যাতে সব রাজনৈতিক পক্ষ ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে আস্থা তৈরি হয়।

এনসিপির মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত অবশ্যই হতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। তবে একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়া হতে হবে সবার জন্য সমান, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে লক্ষ্য করে অনুসন্ধান পরিচালিত হলে সেটি দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান কমিশন বাতিল করে জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এমন একটি কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়েছে, যেখানে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা আরও অভিযোগ করেন, দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কোনো রাজনৈতিক শক্তির রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। তাঁদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে সরকার বা বিরোধী দল—কাউকেই বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না।

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতা ও কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, একটি কার্যকর দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদন্তের স্বচ্ছতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। দুর্নীতির অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক না কেন, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তদন্তের আগে বা তদন্ত চলাকালে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে আগাম ধারণা তৈরি করে।

এনসিপির বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বর্তমান দুদকের গঠন, নিরপেক্ষতা এবং অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা। দলটির দাবি, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, সেটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে আইনি অনুসন্ধান চালানো দুদকের দায়িত্বের অংশ এবং অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফলের আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তদন্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা এবং অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে পাওয়া তথ্য জনসমক্ষে যথাযথভাবে তুলে ধরা। এতে একদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থাও বজায় থাকবে।

এনসিপি সরকারকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। দলটির দাবি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ বানানো হলে প্রকৃত দুর্নীতিবাজরা সুবিধা পেতে পারে এবং পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান কোন পর্যায়ে এগোয় এবং অভিযোগের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া যায়, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের নজর থাকবে। একই সঙ্গে দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত