হরমুজে ‘সিদর’ জাহাজে হামলার অভিযোগ, ক্রু নিহতের দাবি সৌদির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
হরমুজে ‘সিদর’ জাহাজে হামলার অভিযোগ, ক্রু নিহতের দাবি সৌদির

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় সৌদি আরবের একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরব দাবি করেছে, ‘সিদর’ নামের ওই তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে জাহাজটির কয়েকজন ক্রু নিহত হয়েছেন। রিয়াদ এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

বুধবার সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ সামনে আসে। বিবৃতিতে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সৌদি তেলবাহী জাহাজ ‘সিদর’ হামলার শিকার হয়। হামলার ফলে জাহাজে থাকা কয়েকজন নাবিকের প্রাণহানি ঘটেছে বলেও দাবি করা হয়।

তবে এ ঘটনায় ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা দায় স্বীকারের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার প্রকৃতি, দায় এবং হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সৌদি আরবের অভিযোগ অনুযায়ী, ‘সিদর’ জাহাজে হামলা শুধু একটি দেশের বাণিজ্যিক সম্পদের ওপর আঘাত নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হওয়ায় সেখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সংঘাত বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

ঘটনার পর রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে সামরিক হামলার অভিযোগেরও নিন্দা জানিয়েছে। জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সৌদি আরব বলেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অধিকারকে তারা সমর্থন করে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বানও জানানো হয়েছে।

সৌদি আরবের বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশটি বলেছে, সামরিক শক্তি ও সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পথ খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে ‘সিদর’ জাহাজে হামলার ঘটনায় কাতারও উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। দোহা হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। কাতারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথে হামলা বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা আঞ্চলিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে।

কাতারের অবস্থান অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে কোনো ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের নীতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

সৌদি জাহাজে হামলার অভিযোগের পর কুয়েতও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক এলাকায় সংঘাত ও হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

কুয়েতের অবস্থান হলো, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সব ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করতে হবে। সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দেশটি।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার বিষয়টি নতুন নয়। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই সংকীর্ণ জলপথ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক প্রতিযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। ফলে এখানে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বাড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলা ও পাল্টা হামলার দাবিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অভিযোগ তুলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

ইরানের দাবি অনুযায়ী, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ইরানের সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সামরিক উত্তেজনার এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগ সামনে এলো।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব উন্নত ও উন্নয়নশীল—দুই ধরনের অর্থনীতিতেই পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি সাধারণ নাবিক ও জাহাজকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত এসব মানুষ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় তাদের জীবন বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ‘সিদর’ জাহাজে ক্রু নিহতের অভিযোগ সত্য হলে তা সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি দিক তুলে ধরবে।

সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা শুধু একটি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ‘সিদর’ জাহাজে হামলার অভিযোগের পর আঞ্চলিক উত্তেজনা কোন দিকে যাবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যদি পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর হরমুজ প্রণালির দিকে। হামলার অভিযোগ, ক্রু নিহতের দাবি এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এই সংকট যেন আরও বড় সামরিক সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য সব পক্ষকে সংযম ও কূটনীতির পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জোরালো হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত