হ্যারি-মেগানকে ফিরিয়ে নিতেন না ট্রাম্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
হ্যারি-মেগানকে ফিরিয়ে নিতেন না ট্রাম্প

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি যদি ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধান বা রাজা হওয়ার অবস্থানে থাকতেন, তাহলে প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান মার্কেলকে রাজপরিবারে ফিরিয়ে নিতেন না। যুক্তরাজ্যে হ্যারি-মেগানের সাম্প্রতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি দম্পতির সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পর্কের অতীত টানাপোড়েনের প্রসঙ্গ তুলে তাদের আচরণের সমালোচনা করেন।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, হ্যারি ও মেগানের যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার খবরে তিনি খুশি হয়েছেন। তবে তাদের প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি এই দম্পতির ভক্ত নন। তার মতে, রাজপরিবারের সঙ্গে হ্যারি ও মেগানের আচরণ যথেষ্ট অসম্মানজনক ছিল।

ট্রাম্পের বক্তব্যে হ্যারি-মেগান সম্পর্কিত তার আগের অবস্থানেরও প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি বিশেষ করে মেগানের আচরণ নিয়ে সমালোচনা করেন এবং প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতি তার আচরণকে যথাযথ মনে করেননি বলে জানান। তবে এসব মন্তব্য মূলত ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন এবং রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নিয়ে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।

কিছুটা রসিকতার সুরে ট্রাম্প বলেন, তিনি যদি রাজা হতেন, তাহলে হ্যারি ও মেগানকে আবার যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। তার ভাষ্য, ‘আমি তাদের ফিরিয়ে নিতাম না।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কার্যত বোঝাতে চেয়েছেন, রাজপরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে হ্যারি ও মেগানের অতীত সিদ্ধান্ত এবং প্রকাশ্য অবস্থানকে তিনি সমর্থন করেন না।

হ্যারি ও মেগানের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পর্কের টানাপোড়েনের শুরু ২০২০ সালে। ওই বছর তারা রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এরপর তারা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেসিটোতে বসবাস শুরু করেন। রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ‘মেগজিট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে হ্যারি ও মেগান রাজপরিবারের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত জীবন এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও প্রামাণ্যচিত্রে কথা বলেন। এসব বক্তব্যের কিছু অংশ রাজপরিবারের ভেতরের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে। হ্যারি তার আত্মজীবনী এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে ২০২৬ সালের আগস্টে হ্যারি ও মেগান যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের সন্তানদের ব্রিটিশ স্কুলে ভর্তি করার বিষয়টিও এ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, তারা লন্ডনের বাইরে এমন একটি বাড়িতে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন, যেখানে রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি বসবাসের বিষয়টি নেই।

তবে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়া মানেই রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ফিরে আসা নয়। হ্যারি ও মেগান বর্তমানে কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য নন এবং তাদের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ফিরে যাওয়ার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে তাদের প্রত্যাবর্তনকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্পের মন্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, হ্যারি ও মেগানের যুক্তরাজ্যে ফেরার পর এটিই তার প্রথম প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া। এর আগে তিনি বিভিন্ন সময়ে হ্যারি ও মেগানের সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে মেগানের রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য বহুবার সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে।

তবে হ্যারির যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের বৈধতা নিয়ে বিতর্কের সময় ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন হ্যারির অভিবাসনসংক্রান্ত নথি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং তার ভিসা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ ছিল, হ্যারি অতীতে মাদক ব্যবহারের বিষয়টি অভিবাসন নথিতে কীভাবে উল্লেখ করেছিলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এই বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে আদালত হ্যারির ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। সেই সময় হ্যারিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে ট্রাম্প আগ্রহ দেখাননি। বরং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, হ্যারিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তার অগ্রাধিকার নয়। তখনও তিনি মেগানকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।

হ্যারি ও মেগানের নিরাপত্তাব্যবস্থাও তাদের যুক্তরাজ্যে প্রত্যাবর্তনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হ্যারি অতীতে জানিয়েছিলেন, পুলিশের নিরাপত্তা ছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসা তার কাছে নিরাপদ মনে হয় না। এ নিয়ে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াই করেছেন। তবে তাদের সাম্প্রতিক প্রত্যাবর্তনের পর নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ফেরার পরও হ্যারি ও মেগান তাদের বিদেশে থাকা সম্পদ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেসিটো এবং পর্তুগালে তাদের আবাসন রয়েছে। মেগান নিজের লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের জীবনযাত্রা পুরোপুরি যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

ট্রাম্পের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পর্ক অবশ্য হ্যারি-মেগান বিতর্কের তুলনায় বেশ ভিন্ন। ট্রাম্প নিজেকে রাজা তৃতীয় চার্লসের বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন এবং প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতিও তার প্রকাশ্য শ্রদ্ধা ছিল। ট্রাম্প রানি এলিজাবেথের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন এবং যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় সফরও করেছেন।

তবে রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার এই অবস্থানের বিপরীতে মেগানের সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মতপার্থক্য পুরোনো। মেগান রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার আগেই ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন। ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে হ্যারি ও মেগানের একটি ভিডিও বার্তাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তারা ভোটারদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুল তথ্য ও অনলাইনের নেতিবাচকতা প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও তারা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করেননি, সে সময় তাদের বক্তব্যকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে অনেকে দেখেছিলেন।

হ্যারি ও মেগানের যুক্তরাজ্যে প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে ফিরবেন কি না, রাজপরিবারের কর্মরত সদস্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা স্বাভাবিক হবে এবং সন্তানদের জীবন দুই দেশের মধ্যে কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্ন এখন সামনে রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও এটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। রাজপরিবারের পক্ষ থেকে হ্যারি ও মেগানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। ফলে আপাতত ট্রাম্পের মন্তব্যকে তার ব্যক্তিগত মতামত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

হ্যারি-মেগানের যুক্তরাজ্যে ফিরে আসা এবং ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমালোচনা—দুটি ঘটনাই নতুন করে প্রমাণ করছে, রাজপরিবার থেকে সরে দাঁড়ানোর কয়েক বছর পরও এই দম্পতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ কমেনি। তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের দুই ভিন্ন জীবনের মধ্যে ভারসাম্য আগামী দিনগুলোতেও বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত