প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুটা তৈরি পোশাক খাতের জন্য কিছুটা ওঠানামার মধ্য দিয়ে হলেও প্রথম দুই মাস শেষে রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৭১৩ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতটির আয় বেড়েছে ৩৬ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা ৫ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই মাসের এই ইতিবাচক ফলের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আগস্টের শক্তিশালী রপ্তানি। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা পতন দেখা গেলেও পরের মাসে নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই ধরনের পোশাকেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে জুলাইয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে দুই মাসের সামগ্রিক হিসাবে খাতটি ইতিবাচক অবস্থানে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় একটি অংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। দেশের লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বিপুলসংখ্যক পরিবারে আয়-রোজগারের সুযোগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এ খাতের গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। তাই প্রতি অর্থবছরের শুরুতে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধির দিকে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও নীতিনির্ধারকদের বিশেষ নজর থাকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যান সেই জায়গা থেকে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
দুই মাসে নিটওয়্যার বা বোনা পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৩৯৪ কোটি ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ নিটওয়্যার রপ্তানি আয় বেড়েছে ২৪ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও নিটওয়্যার এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকেও আয় বেড়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ৩৩০ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩১৮ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ওভেন পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ।
তবে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের চিত্র ছিল ভিন্ন। ওই মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ডলার। আগের বছরের জুলাইয়ে আয় হয়েছিল ৩৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
জুলাইয়ের পতন শুধু সামগ্রিক পোশাক রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই উপখাতেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। ওই মাসে নিটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২১৫ কোটি ৯ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ২১৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে দশমিক ৯০ শতাংশ।
একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭২ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এ আয় ছিল ১৭৮ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ ওভেন পোশাক রপ্তানিতে জুলাইয়ে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এরপর আগস্টে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। মাসটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৬০ কোটি ৮৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আগের বছরের আগস্টে এই আয় ছিল ৩১৬ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪৪ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার ডলার বা ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।
আগস্টের এই প্রবৃদ্ধিতে নিটওয়্যার খাতের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। মাসটিতে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। আগের বছরের একই মাসে এ আয় ছিল ১৭৭ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে নিটওয়্যার রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রেও আগস্টে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ওই মাসে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আগের বছরের আগস্টে এ আয় ছিল ১৩৯ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, জুলাইয়ের তুলনামূলক দুর্বল পারফরম্যান্সের পর আগস্টে পোশাক রপ্তানির বাজারে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে নিটওয়্যার খাতে প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে পৌঁছানো সামগ্রিক রপ্তানি আয় বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ওভেন পোশাকেও দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হওয়ায় দুই উপখাত একসঙ্গে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করেছে।
পোশাক খাতের এই প্রবৃদ্ধিকে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রধান অবলম্বন। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা, ক্রেতাদের অর্ডার, উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রম ব্যয়, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছুর ওপর এ খাতের রপ্তানি পারফরম্যান্স নির্ভর করে।
বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা বাড়া কিংবা কমার সঙ্গে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব পড়ে। একটি বড় রপ্তানি আদেশ শুধু একটি কারখানার আয় বাড়ায় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুতা ও কাপড় সরবরাহকারী, পরিবহন, বন্দর, প্যাকেজিং, ব্যাংকিংসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। ফলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সুফল অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে প্রথম দুই মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে পুরো অর্থবছরের চূড়ান্ত প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশ—আগামী মাসগুলোতে এসব বিষয় রপ্তানির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আগস্টের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই এখন পোশাক খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
তবু অর্থবছরের শুরুতেই দুই মাসের হিসাবে ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন পোশাক শিল্পের জন্য আশাব্যঞ্জক। জুলাইয়ের নেতিবাচক ফলের পর আগস্টে নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে এখনো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। সামনে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সব মিলিয়ে জুলাই-আগস্টের হিসাব বলছে, নতুন অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দুই মাসে প্রায় ৭৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, শিল্পকারখানার কার্যক্রম এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। আগস্টের গতি পরবর্তী মাসগুলোতেও ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।