শান্তিচুক্তির অগ্রগতি হলেই পুতিনের সঙ্গে বৈঠক চান ট্রাম্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
শান্তিচুক্তির অগ্রগতি হলেই পুতিনের সঙ্গে বৈঠক চান ট্রাম্প

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে শান্তিচুক্তির দিকে বাস্তব অগ্রগতি হলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আবারও শীর্ষ বৈঠকে বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া এমন বৈঠকে বসতে চান না তিনি। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় সময় বুধবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, পুতিন আবারও বৈঠকে বসতে আগ্রহী হবেন বলে তিনি মনে করেন। নিজেও এমন বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহী জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তবে বৈঠকের সময় নির্ধারণে তিনি সতর্ক থাকতে চান। তার লক্ষ্য হবে এমন একটি পর্যায়ে আলোচনা আয়োজন করা, যখন যুদ্ধের অবসানের বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চান, কিন্তু শুধু আলোচনা করার জন্য আলোচনা করতে চান না। বরং শান্তিচুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেই তিনি নতুন শীর্ষ বৈঠক আয়োজনকে উপযুক্ত মনে করবেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ কোনো বৈঠককে তিনি যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে চাইছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। তার মতে, দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা কেবল কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও তা ইতিবাচক হতে পারে। ট্রাম্পের বক্তব্যে একই সঙ্গে যুদ্ধের অবসান এবং বৃহত্তর মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, পুতিনের সঙ্গে বৈঠক দ্রুত আয়োজন করা সম্ভব হলেও তিনি এখনই তাড়াহুড়া করতে চান না। যুদ্ধের অবসানের দিকে পরিস্থিতি আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে চান তিনি। ট্রাম্পের মতে, যুদ্ধ শেষ করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হলে তখন দুই নেতার সরাসরি আলোচনার গুরুত্বও বাড়বে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের আগের অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ শুরু হওয়া উচিত ছিল না। এমনকি ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হলে যুদ্ধটি শুরু হতো না বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্পের এ বক্তব্য তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের জন্য আগের মার্কিন প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করে আসছেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, তার প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত, পুতিনের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তার দাবি, ওই সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে এমন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা তিনি আগে থেকেই করেছিলেন বলেও জানান।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের বর্তমান সম্পর্ককে অত্যন্ত জটিল হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। তার মতে, পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে গভীর বিরোধ রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে এমন একটি পর্যায় তৈরি হতে পারে, যখন উভয় পক্ষই সমাধানের জন্য আরও প্রস্তুত হবে। সেই সময়টিকেই তিনি সম্ভাব্য নতুন শীর্ষ বৈঠকের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে আলোচনার অংশ হিসেবে ট্রাম্প ও পুতিনের সর্বশেষ সরাসরি বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কায়। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর সেটিই ছিল দুই দেশের নেতাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক। আন্তর্জাতিক মহলে ওই বৈঠককে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো লিখিত শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়।

তবে বৈঠকের পর উভয় পক্ষই আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হওয়ার কথা জানিয়েছিল। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে পুতিনও জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিয়ে কিছুটা পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সেই বৈঠকের পরও যুদ্ধের মূল বিরোধগুলোর স্থায়ী সমাধান হয়নি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা, সামরিক জোট এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে। ফলে নতুন কোনো শীর্ষ বৈঠক আয়োজনের আগে এসব বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্র কতটা প্রস্তুত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সম্ভাব্য পরবর্তী পুতিন বৈঠককে আগের বৈঠকের মতো শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ হিসেবে দেখতে চাইছেন না। বরং শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেই সরাসরি বৈঠকে বসার পক্ষে তিনি। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রে ফলাফলমুখী কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি সফল করতে হলে মাঠপর্যায়ে বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজন। সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈঠক অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে না। আবার সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে কঠিন কিছু প্রশ্নে সমঝোতার দরজাও খুলে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন একই সঙ্গে ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে দুই দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো রাখার যে গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ মার্কিন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করতে পারে।

তবে শান্তিচুক্তির পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পারস্পরিক অবস্থানের ব্যবধান কমানো। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব দুই দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, বহু শহর ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় একটি কার্যকর শান্তিচুক্তি শুধু দুই নেতার বৈঠকের ওপর নির্ভর করবে না। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিরোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামোসহ একাধিক জটিল প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন হবে। এসব বিষয়ে সমঝোতা ছাড়া কোনো শীর্ষ বৈঠক হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হতে পারে।

ট্রাম্প অবশ্য আশাবাদী যে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসানের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য সময় আসবে। তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যখন পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে বিরোধের একটি সমাধান খোঁজা সম্ভব হবে। সেই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী বা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে কী ভূমিকা নেবে, তা এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে।

বর্তমানে ট্রাম্পের বক্তব্য মূলত একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বৈঠকের ইঙ্গিত। এটি কোনো নতুন শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়। পুতিনের সঙ্গে আবার বৈঠক কবে হবে, কিংবা রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তিচুক্তির বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

তবু যুদ্ধের অবসানে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন বক্তব্য কূটনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ। যদি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি হয়, তাহলে ট্রাম্প-পুতিনের আরেকটি শীর্ষ বৈঠক সেই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। আর যদি যুদ্ধ অব্যাহত থাকে এবং মূল বিরোধগুলোতে কোনো অগ্রগতি না হয়, তাহলে এমন বৈঠকের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত থেকে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত