নেপালের টানেলে জীবিত উদ্ধারের আশা ফিকে

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬১ বার

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপালের ভয়াবহ বন্যার এক সপ্তাহ পরও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে কাদা, পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে নির্দিষ্ট দূরত্বের পর আর এগোতে পারছেন না। ফলে নিখোঁজ শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতে জানানো হয়েছিল, একাধিক টানেলের ভেতরে ১০০ জনের বেশি শ্রমিক জীবিত অবস্থায় আটকা পড়ে থাকতে পারেন। তবে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ৬৩৯ জন কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এনডিআরআরএমএর মুখপাত্র শান্তি মাহাত জানিয়েছেন, তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান এখনো বন্ধ হয়নি। নেপালের উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন। কিন্তু টানেলের ভেতরে বিপুল পরিমাণ কাদা, পলি ও ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

এএফপিকে শান্তি মাহাত বলেন, কিছু ক্ষেত্রে টানেলে প্রবেশের পথই খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার প্রবেশপথ শনাক্ত করা গেলেও ভেতরে গিয়ে উদ্ধারকারীরা টানেল বন্ধ অবস্থায় পেয়েছেন। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সোমবার উদ্ধারকারীরা দুটি টানেল থেকে অন্তত তিনটি মরদেহ উদ্ধার করেন। কয়েকটি টানেলের ভেতরে তাঁরা কয়েক শ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে এরপর আর সামনে এগোনো সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলবার জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকদের বলেন, উদ্ধারকারীদের সব টানেলেই প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তবে ভেতরে ঢুকে অনুসন্ধান চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ টানেলের বিভিন্ন অংশে পাথর ও পলি জমে পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

উদ্ধার অভিযানের জটিলতা আরও বেড়েছে টানেলের কাঠামোগত অবস্থা এবং বন্যার পর সেখানে জমে থাকা বিপুল ধ্বংসাবশেষের কারণে। কোথাও কোথাও প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নিখোঁজ শ্রমিকদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাঁদের কাছে পৌঁছানো—দুই কাজই সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।

এদিকে ভয়াবহ বন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট ৪৩১ দশমিক ১ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার ১১টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ।

শুধু চালু থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রই নয়, নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোও দুর্যোগের কবলে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণাধীন আরও ১৫টি বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪৭০ মেগাওয়াট।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বন্যা ও ভূমিধসে এসব প্রকল্পের ক্ষতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহতায় প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বুধবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশে দুর্যোগে মোট ১ হাজার ১৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৪৬২ জন।

দুর্যোগের সাত দিন পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়ায় অনেক পরিবারের মধ্যে আশঙ্কা ও হতাশা বাড়ছে। স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

বুধবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে কয়েকটি পরিবারকে নিখোঁজ স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য পালন করতে দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের শেষ বিদায় জানানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজ শ্রমিকদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ দলগুলোর সহায়তায় টানেলের ভেতরের পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজও চলছে।

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধস দেশটির জন্য একসঙ্গে মানবিক ও অবকাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে। একদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন, অন্যদিকে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে।

উদ্ধার অভিযানের প্রতিটি ঘণ্টা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে টানেলের ভেতরে কাদা, পাথর ও পলির স্তর এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া পথের কারণে উদ্ধারকারীদের গতি সীমিত। এর ফলে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে স্বজনদের উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রাথমিকভাবে একাধিক টানেলে শতাধিক শ্রমিক জীবিত থাকতে পারেন বলে যে আশা করা হয়েছিল, এক সপ্তাহ পরও তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় সেই আশা এখন অনেকটাই ফিকে। তারপরও উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারগুলো শেষ সম্ভাবনাটুকু ধরে রেখেছে।

নেপালের জন্য এখন জরুরি হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে উদ্ধারকাজ চালানো, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগে নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। বন্যার তাৎক্ষণিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। আর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ক্ষতি পুনরুদ্ধারেও বড় ধরনের অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। উদ্ধারকারীরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, তাঁদের জীবিত উদ্ধারের আশা ততই ক্ষীণ হয়ে উঠছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com