শ্রীলঙ্কার র‍্যাম্পে বাংলাদেশের নকশিকাঁথার গৌরব

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।


দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক মিলনমেলায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় ফ্যাশন শোতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা, দেশীয় কারুশিল্প ও আধুনিক ফ্যাশনের সমন্বয়ে তৈরি পোশাক নজর কেড়েছে দর্শক ও ফ্যাশনপ্রেমীদের।

গত ১৬ থেকে ১৮ জুলাই কলম্বোর সিনামন লাইফ হোটেলে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ ফ্যাশন আয়োজনে অংশ নেয় দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের নারী ফ্যাশন ডিজাইনাররা। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশের ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতাকে পোশাকের মাধ্যমে তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ থেকে এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশ নেয় লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড সিজ এবং ফ্যাশন ব্র্যান্ড অরণ্য। দেশীয় সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক নকশিকাঁথাকে আধুনিক পোশাকের সঙ্গে যুক্ত করে তারা আন্তর্জাতিক র‍্যাম্পে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরে।

আয়োজকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্থানীয় কারুশিল্প এবং আধুনিক সৃজনশীলতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই ছিল এই ফ্যাশন শোর প্রধান উদ্দেশ্য। শুধু পোশাক প্রদর্শন নয়, বরং বিভিন্ন দেশের নারী উদ্যোক্তা ও ডিজাইনারদের মধ্যে যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করাও ছিল আয়োজনটির অন্যতম লক্ষ্য।

শ্রীলঙ্কার সিলোন চেম্বার অব উইমেন এন্টারপ্রেনার্স এই ফ্যাশন শোর আয়োজন করে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তাঁরা নিজেদের সৃষ্টিশীলতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পান।

বাংলাদেশের ফ্যাশন ঐতিহ্যের সঙ্গে নকশিকাঁথার সম্পর্ক বহু পুরোনো। গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি এই শিল্প শুধু একটি শৈল্পিক কাজ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাস, পারিবারিক গল্প, আবেগ ও জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। একসময় ঘরের ব্যবহারিক সামগ্রী হিসেবে পরিচিত নকশিকাঁথা এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম বাহক হয়ে উঠেছে।

শ্রীলঙ্কার র‍্যাম্পে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সেই ঐতিহ্যকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। দেশীয় নকশা, প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং আধুনিক কাটিংয়ের সমন্বয়ে তৈরি পোশাকগুলো দেখিয়েছে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী শিল্প আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে টেকসই ফ্যাশন বা ‘সাসটেইনেবল ফ্যাশন’ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। হাতে তৈরি পণ্য, স্থানীয় কারুশিল্প এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে আগ্রহ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নকশিকাঁথা ও অন্যান্য হস্তশিল্পের রয়েছে বড় সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজন নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পীদের কাজকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার পথও সহজ হয়।

শুধু পোশাক নয়, একটি দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়ও তুলে ধরে ফ্যাশন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের ঐতিহ্যকে আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এই আয়োজন সেই সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অংশগ্রহণকারী ব্র্যান্ডগুলো দেখিয়েছে, দেশের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক উপস্থাপন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটি বৈশ্বিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে।

বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে আরও অর্থবহ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নারীরা ফ্যাশন ও হস্তশিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ এবং নেতৃত্ব নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে বাংলাদেশের নিয়মিত অংশগ্রহণ দেশের ফ্যাশন শিল্পের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এতে বিদেশি ক্রেতা, বিনিয়োগকারী এবং ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে, যা ভবিষ্যতে রপ্তানি বৃদ্ধিতেও সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও দেশীয় নকশা ও হস্তশিল্পের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এখনো আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। নকশিকাঁথার মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করছে।

শ্রীলঙ্কার এই ফ্যাশন শোতে বাংলাদেশের উপস্থিতি তাই শুধু একটি পোশাক প্রদর্শনের ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি উদাহরণ।

নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে যেমন লুকিয়ে থাকে গল্প, তেমনি শ্রীলঙ্কার র‍্যাম্পে বাংলাদেশের এই উপস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনার গল্প। আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের মঞ্চে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের এই যাত্রা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত