বস্তি থেকে সাফল্যে মহিমা, জানুন সংগ্রামের গল্প

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের বিনোদন জগতে নিজের জায়গা তৈরি করা অভিনেত্রী মহিমা মাকওয়ানার জীবন অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো। আজ তিনি পরিচিত মুখ, সফল অভিনেত্রী, নিজের উপার্জনে তৈরি করেছেন নিরাপদ জীবন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, আর্থিক সংকট, কঠিন পরিশ্রম এবং পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ী অধ্যায়।

নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’ দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসা এই অভিনেত্রীর জন্মদিন আজ ৫ আগস্ট। অভিনয়জীবনে সাফল্যের শিখরে পৌঁছালেও মহিমার শৈশব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোটবেলায় অভিনয় তাঁর স্বপ্ন ছিল না; বরং পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই তাঁকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়েছিল।

মহিমার জন্মের মাত্র পাঁচ মাস পরই তাঁর বাবা মারা যান। বাবার সঙ্গে কোনো স্মৃতি নেই তাঁর। পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মায়ের ওপর। মুম্বাইয়ের একটি ছোট্ট চাওলে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে বড় হতে থাকেন তিনি। সীমিত আয়ের সংসারে প্রতিদিনের জীবন ছিল সংগ্রামের।

মহিমার মা নিজেও একসময় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতিফলন তিনি মেয়ের মধ্যে দেখতে পান। সেই থেকেই মাত্র ৯ বছর বয়সে মহিমাকে নিয়ে শুরু হয় অডিশনের যাত্রা। তবে ছোট বয়সে অভিনয় তাঁর কাছে কোনো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল না; বরং স্কুল শেষে এক অডিশন থেকে আরেক অডিশনে ছুটে চলা ছিল কঠিন এক বাস্তবতা।

যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং স্কুলজীবনের আনন্দ উপভোগ করত, সেই বয়সে মহিমাকে ব্যস্ত থাকতে হতো শুটিংয়ের কাজে। নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক সময় শুধুমাত্র পরীক্ষার সময় স্কুলে যেতে পারতেন।

পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে মহিমা জানিয়েছিলেন, তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে অভিনয় তাঁর কাছে শুধু পেশা ছিল না, এটি ছিল পরিবারের দায়িত্ব পালনের একটি মাধ্যম। ছোট বয়সেই তিনি বুঝেছিলেন, নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

শিশুশিল্পী হিসেবে কাজের সময় একাধিক ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন মহিমা। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতেই একটি ঘটনা তাঁর মানসিকতা বদলে দেয়। একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের শুটিংয়ে অভিজ্ঞ অভিনেতাদের সামনে সংলাপ বলতে গিয়ে তিনি নার্ভাস হয়ে পড়েন। দৃশ্যটি ঠিকভাবে করতে না পারায় পরিচালকের কঠোর মন্তব্য তাঁকে আঘাত করে।

সেই মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে মহিমা বরং নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে আরও বেশি অনুশীলন শুরু করেন। পরে তিনি জানিয়েছিলেন, ওই ঘটনাই তাঁকে বুঝিয়েছিল অভিনয় শুধু প্রতিভার বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং নিরলস পরিশ্রম।

টেলিভিশনে বড় সুযোগ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে মহিমার পরিবারের জীবন। জনপ্রিয় একটি ধারাবাহিক তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে মুম্বাইয়ের মীরা রোড এলাকায় পরিবারের জন্য প্রথম বাড়ি কিনেছিলেন তিনি।

যে পরিবার একসময় ভাড়াবাড়ির ছোট ঘরে দিন কাটিয়েছে, তাদের জন্য এটি ছিল এক অসাধারণ অর্জন। একই সময় তিনি নিজের প্রথম গাড়িও কিনেছিলেন। মহিমার কাছে সেই মুহূর্ত শুধু আর্থিক সাফল্য ছিল না, বরং ছিল মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি।

মহিমা বহুবার বলেছেন, তাঁর মায়ের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা ছিল পরিবারের নিজের একটি বাড়ি হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করাই তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। ছোট বয়সে পাওয়া দায়িত্বই তাঁকে পরিণত করে তুলেছিল।

তবে টেলিভিশনে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও তাঁর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ আসে। ছোট পর্দার অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার কারণে সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। বহু অডিশনে অংশ নিয়েও ব্যর্থ হতে হয়েছে তাঁকে। কখনো কোনো প্রকল্প শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে, আবার কখনো অন্য কাউকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

‘টেলিভিশনের অভিনেত্রী’ পরিচয় থেকে বেরিয়ে বড় পর্দায় নিজের অবস্থান তৈরি করা ছিল তাঁর জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা। কিন্তু ধৈর্য হারাননি মহিমা। ধীরে ধীরে বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজে কাজের সুযোগ পেতে শুরু করেন তিনি।

বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তাঁর কাজ দর্শকদের নজর কাড়ছে। ‘মুসাফির ক্যাফে’ সিরিজে তাঁর অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে তুলেছে। ছোট পর্দার জনপ্রিয় মুখ থেকে নিজেকে একজন পরিণত অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যাত্রা এখনো অব্যাহত রেখেছেন তিনি।

সম্প্রতি মুম্বাইয়ে আরও একটি বড় বাড়ি কিনেছেন মহিমা। নিজের পছন্দ অনুযায়ী সাজানো সেই বাড়ি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক। ছোট চাওল থেকে নিজের বাড়ির মালিক হওয়ার পথটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।

তবে জীবনের সব সাফল্যের মাঝেও একটি শূন্যতা রয়ে গেছে মহিমার মনে। সেটি হলো বাবাকে না পাওয়ার কষ্ট। জন্মের পরপরই বাবাকে হারানোয় বাবার ভালোবাসা বা সান্নিধ্যের অভিজ্ঞতা তাঁর হয়নি।

তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন, অন্যদের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক দেখলে মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি তিনি কখনো জানতে পারেননি। এই অপূর্ণতা আজও তাঁকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।

মহিমা মাকওয়ানার গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের গল্প নয়, এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার এক উদাহরণ। ছোটবেলার অভাব, দায়িত্ব ও কঠিন বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি।

আজ তিনি সফল অভিনেত্রী, নিজের বাড়ির মালিক এবং অসংখ্য মানুষের অনুপ্রেরণা। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো একজন সংগ্রামী মানুষ হিসেবে, যিনি প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন পূরণের পথে বয়স নয়, প্রয়োজন সাহস, পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্প।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত