প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার কূটনৈতিক ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝেই এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্কে যখন চরম বরফাবস্থা বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল আগামী অক্টোবর মাসে রাশিয়া সফরের একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর সফরের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, এফবিআই প্রধানের এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সম্ভাব্য রাশিয়া সফর কেবল অস্বাভাবিকই নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এফবিআই পরিচালকের এই সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সফরটি আগামী ১৪ ও ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে পারে। এই সফরের প্রথম এবং প্রধান গন্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করা হতে পারে রাশিয়ার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক রাজধানী মস্কোকে। এরপর সেখান থেকে প্যাটেলের সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরও পরিদর্শনের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এত বড় একটি সম্ভাব্য সফর নিয়ে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত এর সুনির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি বা বিস্তারিত সূচি প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কিংবা ক্রেমলিনের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে এফবিআই প্রধানের কোনো ধরনের সরাসরি বৈঠক বা আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও মার্কিন বা রুশ কোনো পক্ষ থেকেই এখনো নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি।

রাশিয়াসংক্রান্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্ক এবং তদন্তমূলক ঘটনার সঙ্গে কাশ প্যাটেলের নাম অতীতেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এসব সংবেদনশীল ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শাসনকালে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে রাশিয়ার সরকারের কোনো ধরনের গোপন যোগাযোগ বা আঁতাত ছিল কি না, তা নিয়ে তৎকালীন সময়ে পরিচালিত হওয়া বহুচর্চিত তদন্ত। প্যাটেল সেই সময়ে ওই তদন্তের কার্যকারিতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সংশয় এবং প্রশ্ন তৈরির নানা প্রচেষ্টার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে এফবিআইয়ের পরিচালক হিসেবে শীর্ষ এই পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার এই সম্ভাব্য প্রথম আন্তর্জাতিক সফরটি মার্কিন কংগ্রেসে গভীর নজরদারির মুখে পড়েছে এবং মার্কিন রাজনৈতিক মহলে তীব্র কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে কাশ প্যাটেলের এই সম্ভাব্য রাশিয়া সফরের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পরই তা নিয়ে রুশ সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ও সরকারের অতি ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সংবাদপত্র ‘মস্কোভস্কি কমসোমোলেতস’ এই বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য প্রকাশ করেছে। সংবাদপত্রের আমন্ত্রণে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির অধীনস্থ ‘আরবাতভ ইনস্টিটিউট ফর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা স্টাডিজের’ বিশিষ্ট গবেষক ভ্লাদিমির ভাসিলিয়েভ পত্রিকাটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা বোঝাপড়া চাইতে গেলে এফবিআই পরিচালককে অবশ্যই বিনিময়ে দেওয়ার মতো কোনো শক্ত উপাদান সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে। ভাসিলিয়েভ আরও দাবি করেছেন যে, ডেমোক্র্যাট পার্টি বা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো স্পর্শকাতর ও গোপন তথ্য রাশিয়ার গোয়েন্দা বা নীতিনির্ধারকদের হাতে থাকতে পারে, যা কোনো না কোনোভাবে মার্কিন পক্ষের টেবিলে বিনিময় হিসেবে স্থান পেতে পারে—এমন একটি ধারণা রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এটি রুশ সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, বরং বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতার আলোকে তার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ।
একই সঙ্গে রুশ এই গবেষক আরও যোগ করেছেন যে, আলোচনার টেবিলে কেবল মার্কিন পক্ষই নয়, বরং রাশিয়ারও যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট রসদ থাকতে পারে। মস্কো হয়তো ওয়াশিংটনের কাছে জানতে চাইতে পারে যে এই সহযোগিতার বিনিময়ে তারা কী ধরনের বাস্তব সুবিধা বা ছাড় পেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণে মার্কিন পক্ষ নির্দিষ্ট কোনো কৌশলগত বিষয় নিয়ে কী ধরনের অবস্থান গ্রহণ করে, তা জানার কৌতূহলও রুশ শিবিরের থাকতে পারে। উল্লেখ্য, ভ্লাদিমির ভাসিলিয়েভের রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিষদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে, যে সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন রাশিয়ার অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। ফলে তার এই বিশ্লেষনগুলোকে কূটনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউস ও নিরাপত্তা বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই সম্ভাব্য সফরের সার্বিক আয়োজন বা লজিস্টিক সহায়তার দায়িত্ব পালন করতে পারে রাশিয়ার প্রধান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই এফএসবি হলো সোভিয়েত আমলের সেই কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সরাসরি উত্তরসূরি। তবে এত সব কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সমীকরণ সত্ত্বেও প্যাটেলের এই সফর সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে সফরে তার সঙ্গে রুশ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঠিক কী ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হতে পারে এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক নিরসনে এটি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে, সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি ধোঁয়াশা বজায় রয়েছে।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আজ থেকে দীর্ঘ ১৩ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালে সর্বশেষ কোনো পরিচিত এফবিআই পরিচালক হিসেবে রাশিয়া সরকারি সফরে গিয়েছিলেন রবার্ট মুলার। মজার ব্যাপার হলো, সেই সফরের দীর্ঘ কালপরিক্রমায় পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারশিবিরের সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য গোপন যোগসাজশের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য রবার্ট মুলারকেই বিশেষ কৌঁসুলি বা স্পেশাল কাউন্সেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি একই সঙ্গে মার্কিন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে রাশিয়ার পদ্ধতিগত সাইবার ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগগুলোও অত্যন্ত কঠোরভাবে তদন্ত করেছিলেন। ঠিক সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখেই বর্তমান এফবিআই প্রধান কাশ প্যাটেলের এই সম্ভাব্য রাশিয়া সফরটিকে বিশ্ব রাজনীতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার সর্বাত্মক কূটনৈতিক সংঘাতের এই চরম সময়ে এফবিআই প্রধানের মস্কো ভ্রমণ বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন কোনো মোড় নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।