হংকংয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হংকংয়ে তাপমাত্রার রেকর্ডে নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে। টাইফুন ‘ডলফিন’-এর প্রভাবে উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাস প্রবাহিত হওয়ার মধ্যে রোববার শহরটির প্রধান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৮৮৪ সালে নিয়মিত তাপমাত্রা রেকর্ড রাখা শুরুর পর এটিই হংকং অবজারভেটরির প্রধান কার্যালয়ে নথিভুক্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে জানানো হয়েছে।

এর আগে হংকংয়ের প্রধান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট ওই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। নতুন রেকর্ডটি সেই সীমাকে আরও ০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। তবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা আরও বেশি ছিল। উত্তর হংকংয়ের শুং শুই এলাকায় একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

রোববারের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যাগত রেকর্ড নয়; বরং টাইফুন, উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ এবং ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়ার জটিল সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবেও সামনে এসেছে। একই সময়ে টাইফুন ডলফিন চীনের পূর্ব উপকূলে আঘাত হেনে ব্যাপক বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস এবং পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি করেছে।

হংকং অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে প্রধান কার্যালয়ে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। স্থানীয়ভাবে তীব্র গরমের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ‘অতি গরম আবহাওয়া সতর্কতা’ জারি করে। নাগরিকদের পর্যাপ্ত পানি পান, দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে অবস্থান না করা এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে টাইফুন ডলফিনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা টাইফুনের কথা উঠলে মানুষের মনে ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও দুর্যোগের আশঙ্কাই আসে। কিন্তু কোনো কোনো পরিস্থিতিতে টাইফুনের আশপাশের বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাসকে নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ডলফিনের ক্ষেত্রেও এমন আবহাওয়াগত প্রভাব হংকংয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যা।

রোববার বিকেলে হংকংয়ের অনেক বাসিন্দার জন্য পরিস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ নগরজীবনে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হলে শরীরের ওপর তাপের চাপ আরও বেড়ে যায়। ফলে একই তাপমাত্রা শুষ্ক অঞ্চলের তুলনায় বেশি গরম অনুভূত হতে পারে। কর্মজীবী মানুষ, বাইরে চলাচলকারী শ্রমিক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শিশুদের জন্য এমন পরিস্থিতি বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শহরের বিভিন্ন অংশে তাপমাত্রার পার্থক্যও ছিল উল্লেখযোগ্য। হংকং অবজারভেটরির প্রধান কার্যালয়ে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হলেও শুং শুই এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ নগরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, বাতাসের প্রবাহ, সূর্যালোক এবং নগরায়ণের প্রভাবের কারণে তাপমাত্রায় বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

টাইফুন ডলফিনের প্রভাব শুধু হংকংয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রোববার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের ইউহুয়ানের কাছে স্থলভাগে আঘাত হানে। তখন এর কেন্দ্রে সর্বোচ্চ বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৫১ কিলোমিটার। শক্তির বিচারে এটি স্যাফির-সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি-১ হারিকেনের সমতুল্য।

চীনের পূর্বাঞ্চলে ডলফিনের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত ও শক্তিশালী বাতাস দেখা দেয়। ঝেজিয়াং, সাংহাই, ফুজিয়ান, জিয়াংসু এবং আশপাশের অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। সাংহাইয়ের দুটি বিমানবন্দরে শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়।

রোববারের পরও ঘূর্ণিঝড়টির অবশিষ্ট বৃষ্টিবাহী মেঘ চীনের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব ফেলতে থাকে। সাংহাইয়ের কয়েকটি এলাকায় রাস্তায় পানি জমে যায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ডলফিনকে ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত চীনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন হিসেবে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।

হংকংয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো, টাইফুনের সরাসরি আঘাতের বদলে এর প্রান্তীয় আবহাওয়াগত প্রভাব শহরের তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। হংকং অবজারভেটরি জানিয়েছে, ডলফিন ঝেজিয়াংয়ের দিকে এগিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করার পরও এর প্রভাবে হংকংয়ে প্রচণ্ড গরমের পরিস্থিতি কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে চরম তাপমাত্রার এই ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনাও সামনে এনেছে। বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও ঘনত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে চরম তাপমাত্রার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের আচরণ ও বৃষ্টিপাতের ধরনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট আবহাওয়া ঘটনা এককভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। হংকংয়ের নতুন তাপমাত্রার রেকর্ডের ক্ষেত্রে স্থানীয় আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, টাইফুনের বায়ুপ্রবাহ এবং বৃহত্তর জলবায়ুগত প্রবণতা—সবগুলো বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

রোববারের রেকর্ড হংকংয়ের মানুষের জন্য তাই একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যৎ আবহাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। একটি টাইফুন যখন শহরের ওপর সরাসরি আঘাত না হেনেও তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, তখন চরম আবহাওয়ার বহুমাত্রিক প্রভাব সম্পর্কে প্রস্তুত থাকার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে আবহাওয়া সতর্কতা অনুসরণ করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান না করা এবং বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের অতিরিক্ত গরম থেকে সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। হংকংয়ে ১৮৮৪ সালের পর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড কেবল একটি আবহাওয়ার পরিসংখ্যান নয়; এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়াব্যবস্থার মধ্যেও নগরবাসীর জন্য প্রস্তুতি ও অভিযোজনের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত