প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে দেশজুড়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ ও সরাসরি সম্প্রচারের ওপর নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সমক্ষ্যে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন বিভাগ একটি নতুন ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর গোপন কল রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়ন ও সহিংসতার সংবাদ প্রচার করা থেকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে বিরত রাখতে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে সরাসরি কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই হাইপ্রোফাইল মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের চতুর্থ দিনে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই অডিও ক্লিপটি জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আদালতে প্রসিকিউশনের উপস্থাপন করা ওই গোপন ফোনালাপের অডিও রেকর্ডে ওবায়দুল কাদেরকে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সম্পাদক ও সংবাদ সম্প্রচার ব্যবস্থার ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে স্পষ্ট ভাষায় শোনা যায়। দেশের তৎকালীন বাস্তবতায় সংঘাত, রক্তপাত ও রাজপথের সহিংসতার কোনো ধরনের দৃশ্য বা ছবি যাতে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পর্দায় প্রচার করা না হয়, সে বিষয়ে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে বলেন কাদের। জবাবে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আরাফাত তাকে আশ্বস্ত করে জানান যে, ঠিক তার আগের দিনই সরকারের রোষানলে পড়া কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, যেসব সংবাদমাধ্যম বা টিভি চ্যানেল সরকারের এই অনানুষ্ঠানিক নির্দেশ অমান্য করে মাঠের প্রকৃত চিত্র বা সহিংসতার ভিডিও প্রচার অব্যাহত রাখবে, সেগুলোর সম্প্রচারও তাৎক্ষণিকভাবে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি তাদের হাতে পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফোনালাপের কথোপকথন আরও ভয়ংকর ও উগ্র হয়ে ওঠে যখন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আরাফাত জানান যে, সংঘাতের কোনো ধরনের ছবি, লাইভ ভিডিও কিংবা রক্তপাতের ফুটেজ যদি কোনো চ্যানেল প্রচার করে, তবে সেই নির্দিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলকে সরাসরি ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ বা ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিরকালের মতো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চরম হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে ফোনালাপে উঠে আসে। গণমাধ্যমের এই কণ্ঠরোধের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমস্ত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ সম্প্রচার সার্বক্ষণিক নজরদারির কঠিন ব্যবস্থার কথা গর্বের সঙ্গেই ওবায়দুল কাদেরকে অবহিত করেছিলেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ জিম্মি করা হয়েছিল, এই কল রেকর্ডটি তার এক নির্মম ও বাস্তব দলিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞরা।
কথোপকথনের পরবর্তী অংশে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আরাফাত পরিস্থিতির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চলমান সংকটকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। কল রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি পুরো গণআন্দোলন ও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধকে পাশ কাটিয়ে পরিস্থিতিকে সুকৌশলে দুটি ভাগে ভাগ করে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপনের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি কাদেরকে জানান যে, একপক্ষকে শান্ত ও সরল কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে এবং অন্যপক্ষকে ‘তৃতীয় পক্ষ’ বা জামায়াত-বিএনপির সুনির্দিষ্ট ক্যাডার হিসেবে চালিয়ে দিয়ে তাদের ওপর যাবতীয় সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের দায় চাপানো হবে। আরাফাত আরও উল্লেখ করেন যে, সেই সময়ে সরকারের তরফ থেকে জারি করা কারফিউয়ের কঠোর সিদ্ধান্তটিকে আদতে জামায়াত-বিএনপির তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীদের’ বেপরোয়া ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে দেশবাসীর কাছে প্রচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কোটা আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ভান করে সংকট সমাধানের একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও পুরো বিষয়টিকে সাজানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছিল বলে ফোনালাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়ের করা এই ঐতিহাসিক মামলাটিতে ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ছাত্রনেতা আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও রয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। এর আগে গত রোববার মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তৃতীয় দিনেও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আরও একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কল রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ফোনালাপের অডিও শোনানো হয়। ওই কথোপকথনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগের গতি কমিয়ে দেওয়ার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্লক করার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। তবে পলক তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, এত বড় ও দূরপ্রসারী একটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি অনুমোদন ও সবুজ সংকেত প্রয়োজন হবে।

প্রসিকিউশনের দেওয়া তথ্য ও দাপ্তরিক বিবরণ অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে মামলার অভিযুক্ত সাতজন শীর্ষ আসামির সবাই বর্তমানে দেশের বাইরে আত্মগোপনে কিংবা পলাতক রয়েছেন। আইনের দৃষ্টিতে পলাতক থাকা এই আসামিদের অনুপস্থিতিতেই বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গত বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি তারিখে ট্রাইব্যুনাল-২ এই সাত আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করার আদেশ প্রদান করেছিল। এরপর দীর্ঘ তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বের ধারাবাহিকতায় গত ২ আগস্ট মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ২৮ জন প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ সাক্ষী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে এসে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। বর্তমানে মামলাটি তার অন্তিম পর্যায়ে অর্থাৎ প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ ধাপে রয়েছে। একের পর এক এমন চাঞ্চল্যকর গোপন কল রেকর্ড ও অডিও প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত হওয়ায় জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞ ও গণমাধ্যম নিপীড়নের নেপথ্য কারিগরদের আসল চেহারা আরও বেশি উন্মোচিত হচ্ছে।