গ্যাস সংকটে ফের বাড়ছে তীব্র লোডশেডিং

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
গ্যাস সংকটে ফের বাড়ছে তীব্র লোডশেডিং
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ মিলেছিল মাত্র কয়েক দিন। কিন্তু সেই স্বস্তি টেকসই হলো না। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি সম্প্রতি আংশিক চালুর সুবাদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৭৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়েছিল। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কিছুটা গতি ফিরে এসেছিল এবং দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে এসেছিল। তবে বৈরী আবহাওয়া ও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল পরিস্থিতির কারণে নতুন করে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব না হওয়ায় এবং কিছু কার্গো ফিরে যাওয়ায় দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা আবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেশজুড়ে আবারও তীব্র গরমে বাড়তে শুরু করেছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
গত সোমবার বিকেল থেকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিটের পরিচালনায় থাকা এফএসআরইউ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ নাটকীয়ভাবে কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সব মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহ নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুটে। এই পরিস্থিতিতে সংকট আরও ঘনীভূত হতে চলেছে কারণ পূর্ণ ক্ষমতায় সচল করার জন্য আংশিক চালু থাকা এক্সিলারেটের টার্মিনালটি আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ আরও হ্রাস পাবে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। স্বাভাবিকভাবেই এর জেরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত সোমবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসার প্রধান কারণ ছিল গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়া এবং ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া। এর ফলে গত রোববার মধ্যরাতের পর যেখানে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তা সোমবার মধ্যরাতের পর ২ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। এমনকি মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত লোডশেডিং ১ হাজার থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এলএনজি সরবরাহ হ্রাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে সময় লাগেনি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায় এবং বেলা তিনটার দিকে দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াটে গিয়ে ঠেকে।
বর্তমানে দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনায় দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ চালু রয়েছে। এই দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সর্বোচ্চ সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক প্রায় একশ থেকে একশ দশ কোটি ঘনফুট। কিন্তু বর্তমান বৈরী আবহাওয়া ও অতিরিক্ত বাতাসের কারণে গভীর সমুদ্রে সাগর উত্তাল থাকায় সামিটের টার্মিনালে নতুন কোনো এলএনজি কার্গো যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল ছিল যে আমদানি করা একটি এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পেরে শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুর বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। আগামী পনেরোই আগস্ট নতুন একটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে নতুন কার্গোটি জাতীয় গ্রিডের সাথে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের এই চলমান সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
এদিকে সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটিও আবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত একুশ জুলাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর গত ছয় আগস্ট আংশিক মেরামত শেষে এটি থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল, যদিও এর স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রায় ছাপ্পান্ন থেকে ষাট কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্প্রতি জানিয়েছেন যে মহেশখালীর এই টার্মিনালটি বর্তমানে দুটি বয়লারের মাত্র একটি দিয়ে চালু রাখা হয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হলে এর অপর বয়লারটি সচল করা আবশ্যক এবং এজন্য টার্মিনালটি পুনরায় কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। এতে প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা টার্মিনালের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে, যা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর এর সর্বনিম্ন প্রভাব ফেলার উপায় নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সাথে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গ্যাসের এই তীব্র ঘাটতির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে এবং এর ফলে জনজীবন চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে তীব্র গরমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের কপালে জুটছে মোটে বারো ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ। বারবার লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন। একইভাবে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে গত কয়েক দিন ধরে দিনে ও রাতে পাল্লা দিয়ে চলছে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও সুবিদখালী সদর এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ আসলেও তা টিকছে না। রাতে ভ্যাপসা গরমে ঘুমাতে না পেরে সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে খোলা আকাশের নিচে কিংবা বারান্দায় সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
সিলেট নগরেও দীর্ঘ ও অনাকাঙ্ক্ষিত লোডশেডিংয়ের কারণে নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন যে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকার কারণে কেবল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে না, বরং নগরের সুপেয় পানি সরবরাহ, সড়কবাতি সচল রাখা, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনসহ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে থমকে যাচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের পিডিবি কর্মকর্তারা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম বিদ্যুৎ বরাদ্দের কথা স্বীকার করে জানান যে বাধ্য হয়েই তাদের লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে প্রশাসকের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ সহনীয় মাত্রায় রাখতে তারা লোডশেডিং কমানোর সর্বাত্মক আশ্বাস দিয়েছেন।
বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সংকটের কারণে দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছেন। গোপালগঞ্জ পৌর এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা আঠারো মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র নয় থেকে দশ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় সেখানে অসন্তোষ চরমে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ যে কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পনেরো ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এই পরিস্থিতিতে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন জেলা পুলিশ সুপারের কাছে দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জেও লোডশেডিংয়ের জেরে জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছে। গত পহেলা আগস্ট রাতে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে যখন গত সোমবার সন্ধ্যার ঠিক আগে ওই একই কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট মোকাবিলায় সরকার বেসরকারি খাতকে আরও বেশি মাত্রায় জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের একাধিপত্যের পাশাপাশি যোগ্য এবং স্বচ্ছ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তেল আমদানির উন্মুক্ত সুযোগ দিতে একটি সুনির্দিষ্ট ও সাধারণ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত একটি বিশেষ সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ স্পষ্টভাবে জানান যে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, বরং বাজারের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা এবং সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জেরে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে বাজারে একধরনের কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে ভিড় করেছিলেন এবং কিছু অসাধু চক্রের কারণে কালোবাজারি ও অনলাইনভিত্তিক অবৈধ জ্বালানি বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বিস্তারিত আলোচনার পরই সরকার এই অবরুদ্ধ বাজার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত