১৭ বছর পর ভেনেজুয়েলা-ইসরায়েল কনস্যুলার সেবা চালু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ২০ বার
১৭ বছর পর ভেনেজুয়েলা-ইসরায়েল কনস্যুলার সেবা চালু
প্রকাশ: ১২ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির দীর্ঘ ও জটিল পথপরিক্রমায় এক সুদূরপ্রসারী ও নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রায় সতেরো বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার পর দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের মধ্যে পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন বরফ গলতে শুরু করেছে। দুই দেশের সরকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বৈরিতা ও অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে তারা একে অপরের দেশে পুনরায় কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালুর ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। বিগত দুই হাজার নয় সালে তৎকালীন সময়ে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পৈশাচিক ও রক্তক্ষয়ী হামলার তীব্র প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানিয়ে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন সরকার মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির সাথে তাদের সমস্ত ধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দীর্ঘ সতেরোটি বছর ধরে দুই দেশের মাঝে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বা কনস্যুলার সহায়তা না থাকার ফলে সাধারণ নাগরিক এবং বিশেষ করে উভয় দেশে বসবাসরত অভিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নানা ধরনের চরম ভোগান্তি ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়ে আসছিল।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার মতো একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এই ধরনের পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে যখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পটপরিবর্তন ঘটে চলেছে। গত জানুয়ারি মাসে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আকস্মিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সমগ্র লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে প্রচণ্ড এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই ঘটনার ঠিক পরপরই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের বিচক্ষণ নেতৃত্বে পরিচালিত ভেনেজুয়েলা সরকার ওয়াশিংটনের সাথে নিজেদের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলাতে শুরু করে এবং মার্কিন-ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সাথে নতুন করে কূটনৈতিক সখ্য ও সম্পর্ক জোরদার করার নীতি গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই সমীকরণেরই একটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক ফলাফল হিসেবে তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা এবং ইসরায়েলের মধ্যকার এই দীর্ঘদিনের শীতল যুদ্ধ অবসান হওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি হয়েছে বলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দুই দেশের এই পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলানোর নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে গত জুন মাসে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প। প্রকৃতির সেই নিষ্ঠুর বিপর্যয়ের সময় মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ মানবিক সহায়তাবিষয়ক প্রতিনিধিদল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দুর্গত ভেনেজুয়েলা সফর করেছিল এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ভূমিকম্পের সেই চরম দুর্দিন ও সংকটের মুহূর্তে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের ওই মানবিক সহায়তা এবং তৎপরতা দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্দার আড়ালে নতুন করে আলোচনা ও সংলাপের পথ অত্যন্ত সুগম করে তোলে। তারই ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে দুই দেশের সরকার পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে পুনরায় কনস্যুলার সেবা চালুর এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে একটি বড় ধরনের বিস্ময় ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান সরকার ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং ভেনেজুয়েলার মূল ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা ঐতিহ্যবাহী ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যকার পারস্পরিক ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা ও গুরুত্বকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে স্বীকার করে ও সম্মান জানায়। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ইহুদি সম্প্রদায় দীর্ঘকাল ধরে উভয় দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি শক্তিশালী, বিশ্বস্ত ও ঐতিহাসিক সেতুবন্ধ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই ঐতিহাসিক সেতুবন্ধনকে আরও বেশি মজবুত করা এবং দুই দেশের সাধারণ নাগরিকদের কনস্যুলার ও আইনি সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই চুক্তি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জাদুকরী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল আবিব থেকেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় একই ধরনের একটি ইতিবাচক ও সহযোগিতাপূর্ণ যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতির ধারাকে স্পষ্ট করে তোলে।
তবে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এই নতুন মোড় নেওয়ার পেছনে গভীর কিছু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক হিসাব-নিকাশও কাজ করছে বলে মনে করছেন বৈদেশিক সম্পর্কের অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা। বিগত বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ ইরান ভেনেজুয়েলার অন্যতম প্রধান, পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নানামুখী চাপের মুখে জর্জরিত ছিল। অর্থনৈতিক এই চরম চাপের মুখে সমমনা ও মার্কিন-বিরোধী অবস্থান থেকে ভেনেজুয়েলা এবং ইরান একে অপরের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও গভীর কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা ধরনের হস্তক্ষেপ করার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল তেহরান। এমন একটি জটিল ও স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সাথে পুনরায় কনস্যুলার সম্পর্ক স্থাপনের এই সিদ্ধান্তটি মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকার সামগ্রিক রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহল ধারণা করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত