প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও উচ্চপদস্থ পদে আসীন থেকে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনাগুলো বরাবরই দেশের সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে। এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বর্তমানে কমিশনের অনুপস্থিতি বা শূন্যতা কাটলে এবং খুব শীঘ্রই নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার পর সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এই দুর্নীতি দমন সংস্থার এমন বক্তব্যে সাধারণ সচেতন মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত সূত্রে জানা যায় যে, অতি সম্প্রতি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি কর্তৃপক্ষ সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুসহ দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম এবং ব্যাংকের বেশ কয়েকজন সাবেক শীর্ষ নির্বাহীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির একটি লিখিত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। ব্যাংক খাতের নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে আত্মসাৎ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে এই মহলের বিরুদ্ধে। ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসীন আলী ব্যাংকের দাপ্তরিক স্বার্থে ও পক্ষে সরাসরি দুদকে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এই অভিযোগের প্রাথমিক তালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ছাড়াও ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল মাওলা, আব্দুল হামিদ মিয়া এবং মাহবুব উল আলমসহ মোট আটত্রিশ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই জালিয়াতির বিষয়টি অনুসন্ধান করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দুদকের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সাংবাদিকরা যখন এই স্পর্শকাতর ও উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব সাইদুর রহমান খানের কাছে সুনির্দিষ্ট মতামত জানতে চান, তখন তিনি বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। সচিব সাইদুর রহমান খান স্পষ্ট করে জানান যে, এই মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কোনো কমিশন বহাল নেই। নিয়মানুযায়ী এ ধরনের গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ বা মামলা সরাসরি কমিশনের নীতিনির্ধারক পর্ষদের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও দাপ্তরিক শূন্যতা দ্রুতই কেটে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সচিব মহোদয় উল্লেখ করেন যে, খুব শীঘ্রই নতুন এবং পূর্ণাঙ্গ দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার পরপরই ইসলামী ব্যাংক কর্তৃক জমাকৃত এই অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নেওয়া হবে এবং এর সাথে জড়িত প্রতিটি অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের আর্থিক এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর বিগত বছরগুলোতে যে ধরনের নজিরবিহীন লুটপাট ও দুর্নীতির কালো ছায়া নেমে এসেছিল, এই অভিযোগ তারই একটি নির্মম ও জলজ্যান্ত উদাহরণ। ঋণের নামে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করার এই সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। সাধারণ আমানতকারীদের কষ্টের জমানো অর্থ কীভাবে কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও করপোরেট ব্যক্তিত্ব মিলে তছরুপ করেছেন, তা আজ জাতির সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাবেক রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির নাম এ ধরনের জালিয়াতির সাথে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের এবং দেশের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধরনের এক কলঙ্ক। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কতটা কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

জনসাধারণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে, দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা ও মেগা দুর্নীতির সাথে জড়িত যত বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোক না কেন, তাদের কাউকেই যেন ছাড় দেওয়া না হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির এই অভিযোগের সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত কেবল ইসলামী ব্যাংকের হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্যই নয়, বরং দেশের পুরো বিচারব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠার জন্যও অত্যন্ত জরুরি। দুদক সচিবের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই অভিযোগের তদন্ত এগোবে এবং নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দুর্নীতির এই বরফ গলতে শুরু করবে। পুরো দেশবাসী এখন গভীর উৎকণ্ঠা ও আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছে কবে এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কমিশন দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অপরাধীদের বিচারের কাঠামোগুলোয় দাঁড় করায়।