হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি ট্রাম্পের
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হিসেবে পরিচিত কৌশলগত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, বিশ্ব বাণিজ্যের এই প্রাণকেন্দ্রের ওপর বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্পূর্ণ এবং একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সম্প্রতি মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত প্রিন্স জর্জেস কাউন্টির অন্তর্গত জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে গণমাধ্যমকে জানান যে, বর্তমানে ইরানের সাথে তাদের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ইতিবাচক ও দারুণভাবে এগিয়ে চলেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান এই জলপথের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন বাহিনীর মুঠোর মধ্যে রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পক্ষের একক কোনো নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব বজায় নেই বলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন। মার্কিন নৌবাহিনীর অভাবনীয় ও অপ্রতিরোধ্য শক্তির কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন যে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে একদিকে আলোচনার ইতিবাচক সুর শোনা গেলেও অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটির প্রতি নিজের গভীর অবিশ্বাসের কথাও সম্পূর্ণ রাখঢাক না রেখেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি সাংবাদিকদের সামনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে বলেন যে, বর্তমান তেহরান প্রশাসনকে তিনি কোনোভাবেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন না এবং এই পৃথিবীতে ইরানকে বিশ্বাস করবে এমন শেষ ব্যক্তি হয়তো তিনি নিজেই হবেন। অতীতে আলোচনার টেবিলে তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করা হয়নি এবং তাকে একাধিকবার অসত্য তথ্য বা মিথ্যা বলা হয়েছে বলে তিনি সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দ্বিমুখী ও কঠোর অবস্থানে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য কূটনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে, অন্যদিকে শীর্ষ মার্কিন নেতার এ ধরনের অনমনীয় বক্তব্য দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের গভীর আস্থাহীনতার বিষয়টি আবারও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ ইরান—উভয় পক্ষই বর্তমানে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে একটি ফলপ্রসূ ও টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মুক্ত চলাচলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র থেকে ইতিপূর্বে জানানো হয়েছিল যে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি যৌক্তিক সমাধানের উদ্দেশ্যে দুই দেশের মধ্যকার চলমান অনানুষ্ঠানিক আলোচনাগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিরাট স্বস্তির বার্তা বয়ে আনবে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন ও সরবরাহ পথটি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত হতে পারে এবং গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা তীব্র অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
বর্তমান এই ভূরাজনৈতিক সংকটের নেপথ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ ওমানের কূটনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বৈদেশিক সম্পর্কের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওমান এবং ইরানের মধ্যকার সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার বিষয়ে নিবিড় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ওমান ঠিক হরমুজ প্রণালির বিপরীত প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর আকস্মিক সামরিক হামলা চালানোর পর থেকেই মূলত পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছিল। সেই হামলার তাৎক্ষণিক ও কঠোর প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান কর্তৃপক্ষ কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এর মারাত্মক ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহে নজিরবিহীন বিঘ্ন ঘটে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মাঝপথে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা সাময়িক উন্নতি দেখা দিয়েছিল এবং জাহাজ চলাচলের পথ খোলার ইঙ্গিত মিলেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সেই সমঝোতা স্থায়ী হওয়ার পরিবর্তে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই পক্ষ আবার নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা ও উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে পুনরায় কৌশলগত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জলযান চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি আবার এক গভীর সংকটের মুখে পতিত হয়। হরমুজ প্রণালি আগামী দিনে কত দ্রুত এবং কোন শর্তে পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখনো চরম অনিশ্চয়তা ও সংশয় বজায় রয়েছে। এই সার্বিক অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে। আজ বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি চালুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিবাচক ঘোষণা না আসায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় বাহাত্তর সেন্ট বা শূন্য দশমিক একাশী শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সরাসরি উননব্বই দশমিক তেষট্টি ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি বাজারে বহুল ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও একাত্তর সেন্ট বা শূন্য দশমিক পঁচাশি শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল তিরাশি দশমিক একান্ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির মতো প্রধান তেল রুট বন্ধ থাকার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পোৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ চাপ এবং দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি এবং সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে কতটা সফল হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র বিশ্ববাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত