মিয়ানমারে পাচারের সময় ১৩৬০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ, আটক ৩

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৬ বার
মিয়ানমারে পাচারের সময় ১৩৬০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ, আটক ৩
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নোয়াখালীর প্রত্যন্ত দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মৌলভীচরের নিকটবর্তী মেঘনা নদীর জলপথে এক দুঃসাহসিক ও সফল অভিযান পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। নদীপথ ব্যবহার করে অত্যন্ত গোপনে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে পাচার করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সিমেন্টসহ মোট তিনজনকে আটক করা হয়েছে। রাতের আঁধারে টহলরত কোস্ট গার্ডের চোখের আড়ালে এই পাচার চক্রটি সক্রিয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও কঠোর নজরদারির মুখে তাদের সেই অবৈধ ফন্দি ভেস্তে যায়। উদ্ধার করা হয়েছে ঠিক এক হাজার তিনশ ষাট বস্তা উচ্চমানের সিমেন্ট এবং পাচারের কাজে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনচালিত বাল্কহেড জলযান। জাতীয় অর্থনীতি ও চোরাচালান প্রতিরোধে কোস্ট গার্ডের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ স্থানীয় সচেতন মহলে দারুণ প্রশংসার জোয়ার বইয়ে দিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে যখন পুরো হাতিয়া উপজেলাবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এবং মেঘনা নদীর বুক চিরে ঠান্ডা বাতাস বইছিল, ঠিক তখনই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের একটি বিশেষ চৌকস দল মৌলভীচরের নদী এলাকায় অবস্থান নেয়। কোস্ট গার্ডের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল যে, একটি অপরাধী চক্র রাতের আঁধারে নদীপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে সংগৃহীত সিমেন্টসহ নানা ধরনের নিত্যপণ্য মিয়ানমারের পাচার করার পায়তারা করছে। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা মেঘনা নদীর নির্ধারিত পয়েন্টে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন। রাত প্রায় তিনটার দিকে সন্দেহভাজন একটি ভারী বাল্কহেডকে নদীপথে খুব দ্রুতগতিতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে কোস্ট গার্ডের টহল দল সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং থামার নির্দেশ দেয়।
প্রাথমিকভাবে বাল্কহেডের চালক ও সহযোগীরা পালানোর চেষ্টা করলেও কোস্ট গার্ডের পেশাদার সদস্যদের দক্ষ বেষ্টনীর কারণে তারা সফল হতে পারেনি। এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে ওই জলযানের প্রতিটি কোণায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশির একপর্যায়ে বাল্কহেডের ভেতর অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় এক হাজার তিনশ ষাট বস্তা সিমেন্ট দেখতে পান কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এই বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী দেশের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে নিশ্চিত করেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। অবৈধ এই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে তাৎক্ষণিকভাবে জলযানে থাকা তিন ব্যক্তিকে আটক করা হয় এবং তাদের ব্যবহৃত বাল্কহেডটিকেও জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে নেয় কোস্ট গার্ড।
পরবর্তীতে গত বুধবার রাতে কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন গণমাধ্যমের সামনে এই সফল অভিযানের আনুষ্ঠানিক বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, দেশের জলসীমায় যেকোনো ধরনের চোরাচালান ও অবৈধ পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, আটককৃত তিন ব্যক্তিকে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য হাতিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন কঠোর ভূমিকার কারণে পাচারকারী চক্রগুলোর মনোবল ভেঙে পড়বে এবং দেশের অভ্যন্তরে অপরাধমূলক কার্যক্রম অনেকাংশেই হ্রাস পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উক্ত অভিযানে আটককৃত তিন ব্যক্তির পরিচয় পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটককৃতদের মধ্যে একজনের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়, যার নাম মোু. আবু তাহের এবং তার বয়স আনুমানিক সাতান্ন বছর। অপর দুজন ভোলা সদর উপজেলার বাসিন্দা, যাদের একজনের নাম মো. আলাউদ্দিন বয়স বেয়াল্লিশ বছর এবং অন্যজনের নাম মো. নিরব বয়স পঁয়ত্রিশ বছর। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা এই পাচার চক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন বলে জানা গেছে। কীভাবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এই সিমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং কোন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা মেঘনা নদী হয়ে মিয়ানমারের জলসীমায় পাচার করার পরিকল্পনা ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা বিভাগ বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।
এই ঘটনার পর থেকে হাতিয়া ও এর আশেপাশের নদীবন্দর এলাকাগুলোতে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নদীপথ ব্যবহার করে এ ধরনের চোরাচালান কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে জলপথকে নিরাপদ মনে করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারী চক্র প্রায়ই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ পাচার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। তবে কোস্ট গার্ডের এই সাহসী ও সময়োপযোগী অভিযান প্রমাণ করেছে যে, দেশের জলসীমা সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা সজাগ রয়েছে। এই চক্রের মূল হোতাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ী সমাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত