ইসরায়েলি সেনার সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের সংঘর্ষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৬ বার
ইসরায়েলি সেনার সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের সংঘর্ষ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল ভূরাজনৈতিক সংঘাতে এক অদ্ভুত ও অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হলো অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রাম। ফিলিস্তিনিদের ওপর বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়ন ও ভূমি দখলের দীর্ঘ ইতিহাসের মাঝে এবার এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে, যেখানে খোদ ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে তাদেরই দেশের উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরের अगदी কোলঘেঁষে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গড়ে তোলা একটি নতুন আউটপোস্ট বা স্থাপনাকারী ফাঁড়ি উচ্ছেদ করতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এই মুখোমুখি অবস্থান সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, গত বুধবার কুসরা গ্রামে এই নাটকীয় ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বসতি স্থাপনকারীদের বেপরোয়া ও আগ্রাসী মনোভাবের মুখে পড়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত ওই এলাকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়, যা দখলকৃত ভূখণ্ডের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত বিরল ও নজিরবিহীন এক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের বর্তমান কট্টর ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া ও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে। সরকারের নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়ে তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ও নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের পৈতৃক জমিজমা ও ভূখণ্ড দখল করে নতুন নতুন অবৈধ বসতি গড়ে তুলছে। এই ক্রমবর্ধমান ও লাগামহীন জমি দখলের প্রবণতা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপ সৃষ্টি করেছে। এই চরম চাপের মুখেই গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কুসরা গ্রামে স্থাপিত ওই নতুন ফাঁড়িটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বেআইনি, নিন্দনীয় এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড কেবল ওই এলাকার নিরীহ স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই ব্যাহত করছে না, বরং সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকেও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঘটনার দিন সকালে ইসরায়েলি সেনাসদস্যরা কুসরা গ্রামে উপস্থিত হয়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী বসতি স্থাপনকারীদের দ্রুত এলাকা ত্যাগ করার এবং তাঁবু গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরা সেনাসদস্যদের সেই নির্দেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো তাদের সঙ্গে বাদানুবাদে লিপ্ত হয় এবং একপর্যায়ে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাসদস্যরা ফাঁড়ির দিকে লক্ষ্য করে একের পর এক কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি অংশ ওই অবৈধ ফাঁড়ির তাঁবুর মূল আচ্ছাদন ও নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় এবং পরবর্তীতে এলাকা থেকে পিছু হটে আসে। সেনাসদস্যদের এই সাময়িক প্রস্থানমাত্রই ক্ষুব্ধ ও হিংস্র হয়ে ওঠা বসতি স্থাপনকারীরা আরও বেশি আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। তারা অবরুদ্ধ করে রাখা ফিলিস্তিনিদের তিনটি বাড়ির মধ্যে একটি বাড়ির মূল ফটক ভেঙে ফেলার চেষ্টা চালায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাথর ছুড়ে মারে এবং ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে।
কুসরা গ্রামের এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতির শিকার ফিলিস্তিনি নারী আয়েশা হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে চরম আতঙ্ক ও ভীতির মধ্যে তাদের দিন কাটছে। ঘটনার চার দিন আগে উগ্রপন্থীরা হঠাৎ করেই তাদের বাড়ির একেবারে সামনে এই অবৈধ ফাঁড়িটি স্থাপন করেছিল, যার ফলে তিনি এবং তার পরিবার কার্যত নিজেদের বাড়িতেই বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমাগত হামলা, পাথর নিক্ষেপ এবং হেনস্তার কারণে নার ও শিশুদের মাঝে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। এদিকে, বুধবারই সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে আরেকটি বিবৃতিতে জানানো হয় যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বর্ডার পুলিশ ওই এলাকার অবৈধ তাঁবু সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করেছে এবং সেখানে অবস্থানরত সাধারণ নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। সেনাকর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী সে সময় পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা অব্যাহত ছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল। তবে খোদ নিজেদের দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের এই সংঘর্ষের বিষয়ে পরবর্তীতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কিংবা দেশের পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বা তাৎক্ষণিক আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক যুদ্ধের সময় ইসরায়েল কর্তৃক অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি এবং প্রায় ৫ লাখ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করে আসছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও ইসরায়েল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়নি। ইসরায়েলি মানবাধিকার ও বসতি পর্যবেক্ষণকারী প্রভাবশালী সংস্থা ‘পিস নাউ’-এর সর্বশেষ তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্তমানে মোট ১৪৬টি বড় বসতি এবং ৩৯০টিরও বেশি ছোট ছোট অবৈধ ফাঁড়ি বা আউটপোস্ট রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। কুসরা গ্রামের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে ইসরায়েলি রাষ্ট্রযন্ত্রের তৈরি উগ্রপন্থী এই বসতি স্থাপনকারীরা এখন নিজেদের রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও আইনকেও তোয়াক্কা করতে নারাজ। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াইয়ে সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যকার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরও কী ধরনের গভীর সংকটের জন্ম দেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত