প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন শুল্ক এড়িয়ে চীনা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ সামনে এনেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, চীন সরাসরি পণ্য রপ্তানির পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পণ্যের উৎস আড়াল করছে। এই কথিত ‘শ্যাডো ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে ৪০টির বেশি দেশ যুক্ত থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই তালিকায় ভারতের নামও এসেছে। ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের শুল্কনীতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও কোনো দেশের নাম প্রতিবেদনে থাকা মানেই সেই দেশের সরকার বা সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে শুল্ক ফাঁকিতে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎস এবং প্রতিটি চালানের বাণিজ্যিক কাঠামো আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো সম্প্রতি ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। সেখানে চীনা পণ্যের তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সম্ভাব্য কাঠামো এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের কিছু বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে অন্যায্য হিসেবে চিহ্নিত করে দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় শুল্ক আরোপ করে। এরপর চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি রপ্তানির পরিবর্তে বিকল্প বাণিজ্যপথ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে শুরু করে বলে মার্কিন পক্ষের দাবি।
ওয়াশিংটনের ধারণা, প্রতিবছর তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে ঘুরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো পণ্যের মোট মূল্য ৪ হাজার কোটি থেকে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এই বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য যদি প্রকৃতপক্ষে চীনা পণ্যকে অন্য দেশের পণ্য হিসেবে দেখিয়ে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর এই প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ বলা হয়। বৈধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য যাওয়ার পথে তৃতীয় কোনো দেশের বন্দর বা সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু কোনো পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তি গোপন করে শুল্ক এড়ানোর উদ্দেশ্যে কাগজপত্র বা উৎপাদন পরিচয় পরিবর্তন করা হলে সেটি গুরুতর বাণিজ্যিক অনিয়মের পর্যায়ে পড়তে পারে।
মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথিত এই নেটওয়ার্কে মেক্সিকো, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের নাম রয়েছে। নাভারোর বক্তব্য অনুযায়ী, ৪০টির বেশি দেশের মধ্য দিয়ে চীনা পণ্য ঘুরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে পণ্য যেন সরাসরি চীনের তৈরি পণ্য হিসেবে শনাক্ত না হয় এবং তার ওপর প্রযোজ্য মার্কিন শুল্ক এড়ানো যায়।
এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করতে পারে, তার একটি ধারণাও মার্কিন প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে। কোনো চীনা পণ্য প্রথমে তৃতীয় একটি দেশে পাঠানো হতে পারে। সেখানে পণ্যটির সামান্য পরিবর্তন, প্যাকেটজাতকরণ, নতুন লেবেল লাগানো কিংবা কিছু ক্ষেত্রে সীমিত প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হতে পারে। এরপর সেটি নতুন কাগজপত্র ও চালান তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হলে পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে এখানেই বাণিজ্যিক জটিলতা তৈরি হয়। একটি পণ্যের কোনো অংশ চীনে তৈরি হলেও তৃতীয় দেশে যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন বা রূপান্তর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের আওতায় তার উৎপত্তি নির্ধারণের নিয়ম আলাদা হতে পারে। তাই তৃতীয় দেশে উৎপাদন হওয়া প্রতিটি পণ্যকে চীনা পণ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে উৎপাদনের পরিমাণ, মূল্য সংযোজন, পণ্যের পরিবর্তনের মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের শুল্ক বিধি বিবেচনা করতে হয়।
ভারতের প্রসঙ্গে মার্কিন প্রতিবেদনে পুনে, গুজরাট ও চেন্নাইয়ের উৎপাদন অঞ্চলগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অঞ্চল পাম্প ও কম্প্রেসর উৎপাদন এবং সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন পক্ষের আশঙ্কা, এই ধরনের সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি, ডেটন ও কলম্বাস অঞ্চলের শিল্প সরবরাহব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শিল্পযন্ত্র ও যন্ত্রাংশের সরবরাহব্যবস্থা রয়েছে। ফলে আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে স্থানীয় উৎপাদকদের পাশাপাশি মার্কিন সরকারের শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থাতেও চাপ বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কথিত শুল্ক ফাঁকি শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। ‘ডিটেকটিভ বর্ডার’ নামে একটি এআইভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো চালানের নথিপত্র, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, পরিবহন রুট, মালিকানার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে রপ্তানি পরিমাণের সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করা হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত হলেও যদি তার রপ্তানির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা যায়, তাহলে সেটিকে সম্ভাব্য ঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ছাড়া কম্পিউটার ভিশনের মতো প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে। এর মাধ্যমে পণ্যের ছবি, প্যাকেজিং বা লেবেল বিশ্লেষণ করে আগের চালানের সঙ্গে মিল খোঁজার চেষ্টা করা সম্ভব। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মার্কিন সীমান্ত ও কাস্টমস ব্যবস্থায় শুধু কাগজপত্র নয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো বৈধ সরবরাহব্যবস্থা ও অবৈধ শুল্ক ফাঁকির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা। কারণ বিশ্বায়িত বাণিজ্যে একটি পণ্য একাধিক দেশের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও শ্রম ব্যবহার করে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে শুধু কোনো পণ্যের শেষ গন্তব্য বা শেষ প্যাকেজিং কোথায় হয়েছে, তার ভিত্তিতে প্রকৃত উৎস নির্ধারণ করা সবসময় সহজ নয়।
চীনের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে অনেক কোম্পানি উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, ভারত, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের দিকে নজর দিয়েছে। এতে একদিকে নতুন উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠছে, অন্যদিকে কোন পণ্য সত্যিকার অর্থে কোথায় তৈরি হয়েছে, তা নির্ধারণের প্রশ্নও জটিল হচ্ছে।
ভারতের জন্যও এই অভিযোগ স্পর্শকাতর। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে চীনের বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় উৎপাদন অঞ্চলগুলোকে চীনা পণ্যের কথিত ‘ছায়া নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হলে দিল্লির জন্য তা কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে।
তবে এ অভিযোগের ফলে ভারতের সব ধরনের রপ্তানিকে সন্দেহের চোখে দেখার সুযোগ নেই। কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা প্রতিষ্ঠান শুল্ক ফাঁকিতে জড়িত কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট চালান, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও নথিপত্রের ওপর। একইভাবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্ট প্রমাণ করে না।
বিশ্ববাণিজ্যে এখন তাই নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। শুল্ক আরোপ করলেই যে পণ্যের প্রবাহ থেমে যাবে, তা নয়; বরং কোম্পানিগুলো নতুন উৎপাদনকেন্দ্র, সরবরাহপথ ও বাজার খুঁজে নিতে পারে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র যদি এআইনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিটি ধাপের তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্বও বাড়বে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সংঘাতের প্রভাব যে কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেটিই আবার সামনে আনছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন, রপ্তানি ও সরবরাহব্যবস্থা এর সঙ্গে ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটনের নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা কথিত শুল্ক ফাঁকি কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং এর ফলে ভারতসহ তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা প্রভাবিত হয়।