মানুষের ভেতর নবপ্রাণ সঞ্চারে মঞ্চে ‘রক্তকরবী’

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবিকতা, আত্মমুক্তি ও শোষণের বিরুদ্ধে জাগরণের বার্তা নিয়ে মঞ্চস্থ হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরামের উদ্যোগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় নিজস্ব অডিটোরিয়ামে নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয়। আজ শুক্রবার বিকেল ৫টায় একই স্থানে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় মঞ্চায়ন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরাম প্রতিবছর একটি মূলধারার নাটক মঞ্চায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার প্রথম প্রযোজনা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘রক্তকরবী’। নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় রয়েছেন শ্রেয়শ্রী সরকার। সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ড. মাহফুজা হিলালী।

রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ শুধু একটি নাটক নয়; এটি শোষণ, যান্ত্রিক সভ্যতা ও মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী মানবিক আহ্বান। যক্ষপুরীর প্রতীকী জগতের মধ্য দিয়ে নাটকটি এমন এক সমাজের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে মানুষ তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তি হারিয়ে কেবল উৎপাদন ও ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সেই অন্ধকারে নন্দিনীর আগমন হয়ে ওঠে প্রাণ, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক।

নাট্যনির্দেশক শ্রেয়শ্রী সরকার মনে করেন, বর্তমান সময়েও ‘রক্তকরবী’র প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের অনেক দেশই যেন একেকটি যক্ষপুরীতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ সেখানে শাসন ও ব্যবস্থার চাপে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। যন্ত্রের মতো কাজ করলেও প্রকৃতি, সৌন্দর্য কিংবা জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ তাদের স্পর্শ করছে না।

এই বাস্তবতায় মানুষের ভেতরে আবার প্রাণ ফিরিয়ে আনতে নন্দিনীর প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। নন্দিনী শুভশক্তি ও কল্যাণের প্রতীক। তার উপস্থিতি মানুষের আত্মাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। যন্ত্রসভ্যতার চাপে নিষ্পেষিত মানুষের মুক্তির জন্য তাই ‘রক্তকরবী’র বার্তা নতুন করে সামনে আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই নির্দেশক।

শ্রেয়শ্রী সরকার বলেন, নন্দিনীর শক্তি এমন এক পরিবর্তনের প্রতীক, যেখানে শোষক নিজের তৈরি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শোষিতের পাশে আসতে পারে। একই সঙ্গে শোষিত মানুষের মধ্যেও জেগে উঠতে পারে আত্মমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এই মানবিক জাগরণই নাটকটির অন্যতম প্রধান বক্তব্য।

থিয়েটার ফোরামের এই প্রযোজনার উদ্দেশ্য শুধু একটি নাটক মঞ্চস্থ করা নয়। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুস্থ ধারাকে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং বৃহত্তর বিশ্বপরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েই ফোরামের এই পথচলা। তরুণ শিক্ষার্থীদের নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানোও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

‘রক্তকরবী’র বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাফিসা জান্নাত, জুয়াইরিয়া আব্বাসি, প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা, তরিকুল আলম জীম, শুভজ্যোতি চক্রবর্ত্তী, পূর্ণিমা দাস প্রীতি, সাফওয়ান ফাদলুল্লাহ, মো. তামজিদ ইসলাম, রওনক জাহান লামিয়া, আসফিয়া হক, সারবিনা বিনতে জাফর, নিশাত তাসনিম ফারিহা, তাজবীদ মুহতাসিম ও দিহান চৌধুরীসহ অনেকে।

প্রযোজনাটির মঞ্চ পরিকল্পনা ও সহযোগী নির্দেশনায় রয়েছেন জেরিন চাকমা। মঞ্চ নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন মো. মুসতাকিন মিয়া ও প্রীতি দাশ। সংগীত আয়োজনে রবিউল ইসলাম শশী, পোশাক পরিকল্পনায় সাদিয়া নিশা এবং আলোক পরিকল্পনায় আহসান হাবীব বিপু দায়িত্ব পালন করেছেন। রূপসজ্জা, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা, প্রচার ও অনুষ্ঠান আয়োজনসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন ফোরামের সদস্যরা।

নাটকের মঞ্চায়নে তরুণ অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। রবীন্দ্রনাথের এক শতাব্দী পুরোনো নাট্যভাবনা নতুন প্রজন্মের অভিনয় ও মঞ্চভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে ‘রক্তকরবী’র পরিচিত চরিত্র ও বক্তব্য সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করছে।

বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সহিংসতা, বৈষম্য, অতিরিক্ত ভোগবাদ এবং মানুষের প্রতি মানুষের নির্মমতা যখন নানা সংকট তৈরি করছে, তখন ‘রক্তকরবী’র মানবিক দর্শন নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। নন্দিনীর মুক্তির আহ্বান এখানে কেবল যক্ষপুরীর মানুষের জন্য নয়; বরং এমন একটি সমাজের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ যন্ত্রের অধীন না হয়ে নিজের মানবিক সত্তাকে ফিরে পাবে।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এই আয়োজন সেই ভাবনাকেই তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াস। যক্ষপুরীর অন্ধকারে নন্দিনীর আগমনে যেমন প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যচর্চার এই উদ্যোগও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

আজকের দ্বিতীয় মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই আবার দর্শকের সামনে পৌঁছাবে—মানুষের ভেতরের প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, ভাঙতে হবে শোষণ ও যান্ত্রিকতার বন্ধন। সময়ের সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা ‘রক্তকরবী’ তাই নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে ফিরে এসেছে মানুষকে আবার মানুষ হয়ে ওঠার আহ্বান নিয়ে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com