হালাল সনদের দায়িত্ব এখন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪০ বার
হালাল সনদের দায়িত্ব এখন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে হালাল পণ্যের মান নির্ধারণ ও সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বের কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’ সংশোধন করে হালাল পণ্যের মান ও সনদ-সংক্রান্ত বিষয় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের আওতায় আনা হয়েছে। এ বিষয়ে রোববার ২৩ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর ফলে দেশে হালাল পণ্যের মান নির্ধারণ, সনদ প্রদান এবং এ-সংক্রান্ত সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হলো।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হালাল খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধ, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে হালাল সনদের গ্রহণযোগ্যতা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রপ্তানি সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর সংশ্লিষ্ট অংশে অধিকতর সংশোধন করেছেন। সংশোধনের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন-সংক্রান্ত শিডিউল-১-এ ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন একটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।

‘মিনিস্ট্রি অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স’ শিরোনামের অধীনে আগে থাকা আইটেমের পর নতুন আইটেম হিসেবে ‘ম্যাটার্স রিলেটিং টু হালাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড সার্টিফিকেশন’ যুক্ত করা হয়েছে। সহজ অর্থে এর মাধ্যমে হালাল মান নির্ধারণ এবং হালাল সনদ দেওয়ার বিষয়টি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এতদিন বাংলাদেশে হালাল সনদ নিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ছিল। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসলামিক ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের হালাল সনদ প্রদানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআইও হালাল সার্টিফিকেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ফলে দায়িত্বের ক্ষেত্র ও আইনি ভিত্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে।

নতুন সংশোধনের ফলে অন্তত সরকারি দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হলো। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের তালিকায় হালাল স্ট্যান্ডার্ড ও সার্টিফিকেশন অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে এ খাতের নীতি প্রণয়ন, মান নির্ধারণ এবং সনদ প্রদানের কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

হালাল সনদ একটি পণ্যের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, মাংস ও মাংসজাত পণ্য, দুগ্ধজাত খাবার, প্রসাধনী, ওষুধ এবং বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতারা পণ্যের উপাদান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থায় হালাল মান বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখেন।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। দেশের কৃষি ও খাদ্যভিত্তিক পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে হালাল বাজার একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশে হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো অঞ্চলেও মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং হালাল পণ্যের প্রতি আগ্রহী ভোক্তাদের কারণে বাজারটি বিস্তৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তারা যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য হালাল সনদ নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে তৈরি খাদ্য, হিমায়িত খাবার, মাংসজাত পণ্য, সামুদ্রিক খাবার, প্রসাধনী ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো খাতে নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে শুধু দায়িত্ব ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা হলেই হালাল শিল্পের সব সমস্যার সমাধান হবে না। কার্যকর সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, দক্ষ জনবল, আধুনিক পরীক্ষাগার, স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও ব্যবসাবান্ধব করার পাশাপাশি যাতে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

হালাল সনদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোক্তা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা। একটি পণ্যকে হালাল হিসেবে প্রত্যয়ন করার পর সেই দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার যাচাই এবং ধর্মীয় মানদণ্ডের যথাযথ অনুসরণ থাকতে হয়। ফলে সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর যেমন দায়িত্ব বাড়বে, তেমনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নির্ধারিত মান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

বিশ্ববাজারে হালাল পণ্যের প্রতিযোগিতা এখন ক্রমেই পেশাদার ও মাননির্ভর হয়ে উঠছে। শুধু পণ্যের গায়ে হালাল লেখা বা একটি সনদ ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সনদের উৎস, স্বীকৃতি, পরীক্ষার পদ্ধতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনা করেন। এ কারণে বাংলাদেশের জন্য এমন একটি সার্টিফিকেশন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যার সনদ বিদেশি বাজারেও সহজে গ্রহণযোগ্য হয়।

সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তাই শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পরিবর্তন হিসেবে দেখলে এর পুরো গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর মাধ্যমে দেশের হালাল শিল্পকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে দায়িত্ব নির্ধারিত হওয়ার পর এখন প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা, শিল্পোদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক, মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।

বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যা এবং মুসলিম ভোক্তাদের বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে হালাল সনদ ব্যবস্থাকে কেবল কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে মান, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

নতুন করে রুলস অব বিজনেস সংশোধনের ফলে হালাল মান ও সনদ দেওয়ার বিষয়টি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থান পেল। এখন এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের হালাল শিল্পের ভবিষ্যৎ। সঠিক নীতিমালা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারলে দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজারের দরজা খুলতে পারে। একই সঙ্গে হালাল পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতিও আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com