কপ-৩১ সম্মেলনে নভেম্বরে তুরস্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬২ বার
কপ-৩১ সম্মেলনে নভেম্বরে তুরস্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ অংশ নিতে আগামী নভেম্বরে তুরস্ক সফর করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ২৩তম ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসির কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্সের বৈঠকের সাইডলাইনে তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুলাকলিকায়ার সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বৈঠকেই তিনি তুরস্কের প্রতিনিধিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন সফরের বিষয়টি জানান।

কপ-৩১ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ৩১তম আয়োজন। এবারের সম্মেলন তুরস্কে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ফলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় দেশের স্বার্থ, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই দৃশ্যমান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও অতিবৃষ্টির মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার মানুষকে নিয়মিত জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা এবং উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আদায়ের চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অংশ নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের প্রত্যাশাগুলো সরাসরি আন্তর্জাতিক নেতাদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জলবায়ু অর্থায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা সম্ভব হবে।

জেদ্দায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়েই আলোচনা করেননি; দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়েও মতবিনিময় করেন। আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করে।

বৈঠকে বিদ্যমান সহযোগিতার মাত্রা নিয়ে উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনীতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে দুই দেশের আগ্রহের কথা উঠে আসে। বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও বিভিন্ন পণ্যের জন্য তুরস্ক একটি সম্ভাবনাময় বাজার। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, শিল্প, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিও দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফর সেই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। কপ-৩১ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যদিও সফরের বিস্তারিত কর্মসূচি ও সম্ভাব্য চুক্তিগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে এর গুরুত্ব রয়েছে।

এদিকে আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের অভিন্ন বা কাছাকাছি অবস্থান রয়েছে। ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। জেদ্দার বৈঠকেও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও তুরস্ক উভয়ের জন্যই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কূটনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং পর্যটনের মতো খাতেও ভবিষ্যতে সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য তুরস্ক সফর তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। জলবায়ু সম্মেলনের পাশাপাশি তুরস্কের নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হলে সেখানে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে কী ধরনের নতুন উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা আলোচনায় আসতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কপ-৩১-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু অর্থায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে উন্নত বিশ্বের কাছে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে জলবায়ু অভিযোজনের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। কৃষি, পানি, উপকূলীয় অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অবস্থান হলো—যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তাদের কাছ থেকে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য আরও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে অংশ নিলে এই দাবিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনীতি যেমন লাভবান হবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।

তুরস্কের সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতার সুযোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তুরস্ক নিজেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। ফলে দুই দেশের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে।

জেদ্দায় বৈঠকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের বিষয়টি আগাম জানানো বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং সম্ভাব্য চুক্তিগুলোর বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসার অপেক্ষা রয়েছে।

সব মিলিয়ে আগামী নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফর বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে জলবায়ু কূটনীতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ঝুঁকি ও অর্থায়নের দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে সফরটি বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক ফল বয়ে আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com